Connect with us

গল্প

পাপবোধ || অরুণ কুমার বিশ্বাস

Published

on

পাপবোধ || অরুণ কুমার বিশ্বাস

পাপবোধ || অরুণ কুমার বিশ্বাস

সুনসান শীতের রাত। বাইরে নিকষ আঁধার। যেন কুয়াশার দুর্ভেদ্য চাদর মুড়ে দিয়েছে প্রকৃতি। অবশ্য কালের বিচারে সময়টা শীত না হয়ে গ্রীষ্ম হলেও কিছু আটকাতো না। তোরাবের কাছে সময়টা বড্ড বৈরী ঠেকছে এখন। তার চোখে ঘুম নেই। রাতের নীরবতা তাকে মোটেও স্বস্তি দেয় না। দিনটা বরং কোনভাবে কেটে যায়, টুকটাক ব্যস্ততায়। রাত নামলেই বড্ড একা হয়ে যায় ত্রিশোর্ধ্ব তোরাব আলী।

শহরেই কিছু করতে চেয়েছিল তোরাব। চাকরিও নিয়েছিল। কিন্তু অফিসের ম্যানেজার লোকটাকে তার মোটেও ভাল লাগে নি। মানুষ তো নয়, যেন একটা জাত খচ্চর। বুকঅব্দি ভুঁড়ি ঠেলে ওঠা লালচুলো ম্যানেজার শফিক ভেবেছিল তোরাবকে দিয়ে সবকিছু করিয়ে নেয়া সম্ভব। কারণ তার টাকার দরকার।

আচ্ছা, টাকার কার না দরকার হয় বলুন ! তাই বলে মেয়েছেলের দালাল! শফিক সাহেবের নারীলোলুপ দৃষ্টি শুরুতেই চোখে পড়ে তোরাব আলীর। ছেলেছোকরাদের সারাক্ষণ তুই-তোকারি করলেও অফিসের মেয়ে কলিগদের প্রতি সে যেন বড়ই সদয়। এসো না বসো না, মা-মনি, মিষ্টিমনি এসব বলেই অমনি মওকা বুঝে গায়ে হাত ছুঁইয়ে দেবে! তারপর রিঅ্যাকশন দেখে মাছে টোপ গিলেছে বুঝলে অমনি তার ব্যাচেলর মেসে নিয়ে গিয়ে তুলবে।

ছুকছুকে স্বভাবের জন্য কেউ তার খুব একটা কাছে ঘেঁষতে চাইতো না। গায়ের জোরে সব হয় না বুঝতে পেরে ভায়া মিডিয়ার আশ্রয় নেয় খচুরে প্রকৃতির ম্যানেজার শফিক। আর তার সহযোগী হিসেবে তোরাবকে বেছে নেয়। ভেবেছিল, গাঁয়ের থেকে উঠে আসা বোকাসোকা ছেলেটাকে দিয়ে মেয়েধরার কাজটা দিব্যি চালিয়ে নেয়া যাবে।

একথা সত্যি, টাকার ভীষণ দরকার ছিল তোরাব আলীর। বাপ নেই, মা অসুস্থ। ভাই-বোনদুটি এখনও সোমত্ত হয় নি। বোনটা পরের বাড়িতে কাজ করে মায়ের বদলি হিসেবে। ভাই তার স্কুল না ছাড়লেও খুব বেশি দিন ওমুখো হবে বলে মনে হয় না। মাথার পরে ছাদ না থাকলে মালিকবিহীন ষাঁড়ের যে অবস্থা হয় আর কি। অনেকটা যেন উন্মূল শ্যাওলার মতো। থিতু হবার কিছু নেই।

কাজটা পারবে তো তোরাব আলী ? অনেক ভেবেচিন্তে তোমাকে কিন্তু নিয়েছি। ঘোরেল হেসে কথাটা বলল শফিক সাহেব। তারপর মনের কথা পুরোটা সে ধরতে পারে নি ভেবে একটু লেজুর জুড়ে দেয়- জানো তো, এই পোস্টে ঢোকার জন্য মেলা চেষ্টাতদবির ছিল। আমার নিজের শ্যালকও সিভি ঠুকেছিল। আমি নিই নি তোরাব। শালা-জামাইবাবু একখানে থাকলে কাজের চেয়ে অকাজ হয় বেশি। বাইরের খবর ঘরে ঢুকে যায়। ফলে মহা অশান্তি।

কথা শুনে রিফ্লেক্স অ্যাকশনের মতো তোরাবের মুখ ছিটকে বেরিয়ে গেল- স্যার, আপনি বিবাহিত ? মানে আপনার বউ আছে ?

কেন থাকবে না। আলবাত আছে। এনি প্রবলেম ? সরু চোখে তোরাবের দিকে তাকায় শফিক। যেন মস্ত অপরাধ করে ফেলেছে। তা তো একটু সে করেইছে। অনধিকার চর্চা। চাকরিটা এরপরও থাকলে হয়।

না মানে, স্যার কিছু না। বারদুয়েক খাবি খেয়ে কোনমতে পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টা করে তোরাব আলী।

ম্যানেজার শফিকের দুকান কাটা। তোরাব কী ভাবলো তাতে কিছু এসে যায় না। দুজনের মাঝে বোঝাপড়া থাকলেই বরং ভাল। সুরে রস মিশিয়ে বলল, ঘরে যার বউ আছে অফিসে বুঝি তার বান্ধবী থাকতে পারে না! মাসে মাসে বেতন পেলে কি উপরি নেয়া বারণ! নেতারা যে গাছের খেয়ে তলারটা কুড়ায়, তাতে কে আপত্তি জানিয়েছে! বলো তোরাব, আমি কি কিছু ভুল বলেছি!

তোরাব কিছু বলে না। দুবলা বাছুরের মতো এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ে। কথা কম বলে তাই চাকরিটা এখানে মোটামুটি পাকা হয়ে যায়। সে জানে, আরবিতে একটা কথা আছে- মান সাকাতা সালিম। মানে যে নীরব রইলো, সে নিরাপদ থাকলো। উচ্চমাধ্যমিক ফেল গেঁয়ো ছেলে তোরাব আলী। তাকে কে সেধে চাকরি দেয়! তারও আবার ফিমাসে মাইনে। চাকরিটা পেয়ে সে রীতিমতো বর্তে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক।

অফিসে তোরাবের অবশ্য নিজস্ব কোন ডেস্ক বা পোর্টফোলিও নেই। তাই বলে সে অদরকারী তাও নয়। অনেকটা দপ্তরবিহীন মন্ত্রীর মতো। আপাতত ম্যানেজারের ফুটফরমাশ খাটে। স্পেশাল কাজ করে দেয়। বলা যায়, তোরাব আলী ইজ অ্যা ‘পারসন অন স্পেশাল ডিউটি’-পি এসডি।

মেয়েটা কেমন, তোরাব ? একদিন সাতসকালে নিজের চেম্বারে ডেকে নিয়ে সুখ সুখ গলায় শফিক বলল।

কোন্ মেয়েটা স্যার?

ক’টা মেয়ে আছে আমার অফিসে ? কিছুটা উষ্ণ হয় শফিক।

না মানে স্যার, গোটাতিনেক ছিল। তোতলায় তোরাব আলী।

আর এখন ?

পুরনোদের মধ্যে একটাও নেই। নতুন একটা এসেছে।

নতুন একটা মানে ? মেয়েদের সম্মান দিয়ে কথা বলতে শেখ। মেয়েরা কি পায়রা না ময়ূরপক্ষি ? ঠোঁটে লাগাম দাও তোরাব। নইলে বিপদে পড়বে। কপট ধমক দেয় শফিক। কিংবা আদরের সম্ভাষণ।

তোরাব প্রায় বলে ফেলেছিল, স্যার, আপনিই একদিন বললেন মেয়েরা হল দিয়ে ডিমে তা দেয়া পায়রার মতো। দেখলেই বুকে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বসের মেজাজ বুঝে মুখে কুলুপ আঁটে তোরাব। চাকরিটা থাকা চাই। নইলে মায়ের চিকিৎসা হবে না। বোনটা আইবুড়ো থেকে যাবে। ধনেপ্রাণে মারা পড়বে সবাই মিলে।

এবার বলো নতুন মেয়েটা দেখতে কেমন? কী যেন নাম তার-

তোরাব বোঝে, ম্যানেজারের নামধাম সব মনে আছে। তাও একটু বাজিয়ে নিতে চায়। ওর উপর দায়িত্ব ছিল নতুন জয়েন করা লায়লা ম্যাডামের হাঁড়ির খবর জেনে নেয়া। মানে কেমন ফ্যামিলির মেয়ে, সাতকুলে আর কে আছে। আর্থিক অবস্থা ভাল কি মন্দ।

কাজে ফাঁকি দেয় না তোরাব আলী। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর টু-দ্য-পয়েন্ট টুকে নিয়েছে। লায়লা জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ করেছে। বাসার অবস্থা খুব ভাল না। দুইবোন একভাই। ভাইটা ছোট। মা নেই। বাবাটা মদারু। নিত্যরাতে তার দুঢোক না গিললে চলে না। ছাপাখানায় সামান্য বেতনে কাজ করে।

ফাশক্লাশ ! শফিক খুব খুশি হয়।

স্যার, প্রথম শ্রেণি কেন ! দ্বিতীয় শ্রেণি নয় কেন ? তোরাব জানতে চায়।

তুমি বুঝবে না গারল। লায়লা মেয়েটা ঠিক আমি যেমনটি চাই, তেমন। আর্থিক অবস্থা নড়বড়ে মানে আমার কথা শুনবে। খুব একটা বেগরবাই করবে না। কারণ তার খুঁটির জোর নেই।

বাপ নেশারু। মানে নিত্য লাঠিপেটা করে। এমন মেয়েরা একটু আদরের আভাস পেলেই গলে একেবারে আইসক্রিম, বুঝলে হাঁদা। ডুবন্ত পিঁপড়ে যেমন শুকনো পাতা পেলেও আঁকড়ে ধরে।

হারামজাদা! জাত খচ্চর! তোরাব মনে মনে বলে।

তোরাব কিছু বললে ?

না স্যার। লায়লা ম্যাডামকে কিছু বলতে হবে ?

নাহ তুমি কিছু বলবে না। যা বলার আমি বলবো। ওকে আমার চেম্বারে পাঠিয়ে দাও। বলেই অমনি টেবিলে তাল ঠুকতে থাকে ছুকছুকে স্বভাবের শফিক। পায়রা তার পছন্দ হয়েছে।

লায়লা এলো। গরিব হলেও সে সহবত জানে। শফিককে সালাম করতে গিয়ে শিফনের ওড়নাটা মেঝেতে গড়াগড়ি খেল। উবু হয়ে তুলতে যেতেই মোক্ষম মওকা পেয়ে যায় নারীলোলুপ শফিক। শকুনের মতো বুভুক্ষু দৃষ্টি ঠুকে যা দেখায় দেখে নেয়।

বাহ্ সরেস দেখছি। স্বগতোক্তি করে শফিক। না দেখেই বলা যায়, তার জিভে পানি গড়ায়।

তারপর শুরু হয় লায়লার পোস্ট-অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইন্টারভিউ। শফিকের মতে, চাকরি পাবার চেয়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন।

আগে কোথাও কাজ করেছো? শুরুতেই তুমি। হেব্বি রোম্যান্টিক।

না স্যার, এটাই আমার প্রথম জব। আপনার অনেক থ্যাঙ্কস স্যার, আমাকে চুজ করার জন্য।

উঁহু, ধন্যবাদ পরে দেবে। দেখো, কাজটাজ বুঝে উঠতে পারো কি না। তোমার জবটা কী জানো তো- ক্লায়েন্টকে কোন না কোনভাবে বোঝানো চাই যে, আমরাই তাদের পছন্দের পণ্যটি সাপ্লাই দিতে পারি। এর নাম ইনডেন্ট। যার চেহারা যত চকচকে, ঠোঁটে যত বেশি মধু ঝরে, তারাই তত বড় বড় ক্লায়েন্টকে স্যাটিসফাই করতে পারে।

স্যাটিসফ্যাকশন মানে ঠিক বুঝলাম না স্যার। লায়লাকে সহসাই সন্ধিগ্ধ মনে হয়।

এটা তোমার প্রথম জব মিস লায়লা। বলতে পারো ডেবিউ প্লেসমেন্ট। বুঝবে না এটাই স্বাভাবিক। শোনো, পাবলিককে খুশি করতে গেলে শুধু পণ্য সাপ্লাই দিলেই হয় না, কখনও কখনও পণ্য হতে হয়। আমাকে হ্যাপি রাখাও তোমার কাজের মধ্যে পড়ে, মাইন্ড ইট।

জি স্যার। ওড়না গোছাতে গোছাতে লায়লা উঠে এলো শফিকের রুম থেকে।

শুরুর ইন্টারভিউ আপাতত শেষ হল। শফিক চমৎকৃত। সে নিশ্চিত, এই মেয়ে ছলাকলা সব জানে। নইলে রুমে ঢুকতে না ঢুকতেই ওড়না উড়বে কেন! সবকথা বাদ দিয়ে কেবল ‘স্যাটিসফ্যাকশন’ নিয়ে তার এত মাথাব্যথা কেন হবে! মেয়ে যা বোঝার বুঝে গেছে। শফিকের জন্য জবরদস্ত শিকার। যাকে বলে খাপের খাপ, বুকের উপর জলছাপ।

ওদিকে তোরাব আলী বসের দরজায় কান ঠেকিয়ে ছিল। শোনা যাক, নতুন পায়রা কিসে আপ্যায়িত হয়! টুকটাক কথাবার্তায় বোঝা যায়, বস তার লাইন মতোই এগোচ্ছে। দেখার বিষয় লায়লা ম্যাডাম কতোটা খুল্লাম খুল্লা চরিত্রে নাচতে পারে।

তবে শফিক আজ খুব একটা এগোয় নি। ইশারা-ইঙ্গিতে থেমে ছিল দেখে তোরাব খুশি। লায়লা মেয়েটাকে তার ভদ্রই মনে হয়। চরিত্রহীন বসের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আখের গোছানোর মতো রঙঢঙ এখনও শেখা হয়ে ওঠেনি।

সব মোটামুটি চলছিল। তোরাবের ভ‚মিকা এখানে দ্বিবিধ। বসের সামনে তাকে অনুগত সারমেয়র মতো কুঁইকুঁই লেজ নাড়তে হয়। আবার লায়লাকে বড়বোন সম্বোধন করে। মেয়েটাকে সে ভালওবাসে। বাসবে নাই বা কেন! প্রায় নিত্যদিন লায়লা দুপুরের খাবার কিছুটা তুলে রাখে তোরাবের জন্য। আহা বাপমরা ছেলেটা। ঠিকঠাক খায় তো!

লায়লার আন্তরিকতা তাকে স্পর্শ করে। আবার হয়তো করেও না। এই গরিব জাতটার চরিত্র বলে কিছু নেই। জাস্ট সুযোগ নেই। পেলে ভাল, না পেলেই অমনি মুখ গোমড়া। তবে তোরাবে বিশ্বাস করে লায়লা। এও মেনে নেয় যে শফিক লোকটা হয়তো মন্দ নয়। একটু গায়েপড়া স্বভাব- এই যা। বউয়ের কেয়ার না পেয়ে একটু বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

ঠিক মাসখানেকের মাথায় এক বিকেলে-

বসের রুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো লায়লা। অফিসের অন্য স্টাফরা বসের কাণ্ডকীর্তি সব জানে, নয়তো জেনেশুনেই জেগে ঘুমায়। এরা কাপুরুষ। এরা সব টাকার গোলাম। ঘেয়ো কুকুরের মতো নিত্য হাটে মার খায়, অথচ টু শব্দটি করে না। এর নাম জীবন নয়, স্রেপ টিকে থাকা।

লায়লার চোখে জল। চোখ নামিয়ে নেয় তোরাব আলী। কারণ এই বসের ব্যাপারে প্রশংসার ফুলঝুরি তো সেই শুনিয়েছে লায়লাকে। বস মানুষটা ভালো। বউটা ভাল না। শুধু টাকা টাকা করে, আর অল্পবয়সী ছেলে-ছোকরাদের নিয়ে শপিং মলে ঘুরে বেড়ায়। বসের কথা একটুও ভাবে না। বস খুব নিঃসঙ্গ- এই সব কাল্পনিক ছাপচিত্র এঁকে সেঁটে দিয়েছে লায়লার মনের ক্যানভাসে। জাস্ট সিমপ্যাথি আদায়ের চেষ্টা।

বলো তোরাব, তোমার স্যারের প্রবলেম কী ? জবাব দাও। লায়লা খেপে লাল।

কী প্রবলেম ম্যাডাম। যেন কিচ্ছু জানে না তোরাব।

লোকটা একটা লম্পট। বদের হাড্ডি। হিসহিসিয়ে বলে লায়লা।

কেন কী করেছে ম্যাডাম ? গায়ে হাত দিয়েছে ?

তুমি সব জানো তোরাব। তুমিও একটা মিচকে শয়তান। আমি এখন সব বুঝতে পারছি। এই লোকটার পক্ষে তুমি কত সুনাম করেছ। কেন?

ছি ম্যাডাম, আমি কিচ্ছু জানি না। তবে একটা কথা – তোরাব কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। বা এটাও ওর বসের শেখানো একটা চাল।

কী কথা তোরাব, বলো। নইলে আমি অফিসের সব্বাইকে ডেকে সব বলবো। লায়লা মারমুখী এখন।

ঠাণ্ডা হন ম্যাডাম। মাথা গরম করলে আপনারই ক্ষতি। শান্ত হোন।

কী বলবে বলো। নইলে আমি চললাম।

কোথায় যাবেন ম্যাডাম ?

থানায়।

থানার কথা শুনে তোরাব আলি একটু থতায়। বা ভয়ের ভান করে। পরে অবশ্য নিজেকে সামলে নেয়। চালিয়াতির সুরে বলে, থানায় যাওয়াটা কি ঠিক হবে ম্যাডাম! আগে আমার কথাটা শোনেন। নইলে পরে হয়তো পস্তাতে হবে।

হুমকি। লায়লাকে রীতিমতো হুমকি দিচ্ছে তোরাব। গাঁয়ের সেই ছাপোষা ছেলেটা ধমকি দিতেও শিখে গেছে! আশ্চর্য!

বসের রুমে গোপন ক্যামেরা আছে, জানেন ? থানাপুলিশ করলে আপনারই ক্ষতি হবে। ছোট্ট ঘটনা নিয়ে কানাকানি ছানাছানি- সে যাচ্ছেতাই ব্যাপার, তাই না ম্যাডাম। বুঝমানের সুরে বলল তোরাব।

লায়লা সাথে সাথে চুপ মেরে যায়। আমাদের মেয়েদের এই এক প্রবলেম- অস্তিত্বের চেয়ে সম্মান বড়! দাঁতে দাঁত পিষে বলল, তুমি যা করলে মোটেও ভাল করো নি। তোমার মতো ছেলেদের কী বলে জানো- পিম্প। মেয়েছেলের দালাল। তুমি যত ইচ্ছে দালালি করো তোরাব। আমি কিন্তু মেয়েছেলের দলে নই। তুমি ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছো।

ছি তোরাব, তুমি এত খারাপ! এত নীচে নামতে পারলে! যাকে ছোটভাইয়ের মতো আদর করে খাইয়েছি, সে-ই কিনা পেছন খেকে ছুরি মারলে!

লায়লা অফিস ছেড়েছে, তার সম্ভ্রমের ভয় আছে। কিন্তু লম্পট শফিক তার পিছু ছাড়ে নি। পায়রাটা যে তার বড় মনে ধরেছে। তোরাব আলীও এঁটুলির মতো লেগে আছে। তার খাই বেশি। বস্ বলে দিয়েছে, এই পাখিটারে তার চাইই চাই। ছলেবলে কলে-কৌশলে কোন মতে তার মেসে এনে ফেলতে পারলেই হয়। দালালি খরচ কড়কড়ে কুড়ি হাজার টাকা।

তোরাব আলীর মানবতা নিমিষে ঘুমিয়ে যায়। টাকার টাটকা গন্ধ তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। সম্ভ্রমের ভয়ে লায়লা আপাতত চুপ থাকলেও তোরাব মেয়ের বাবার সাথে যোগাযোগ করে। তাকে মেলা টাকার লোভ দেখায়। সাথে দুবোতল দিশিমদ। বাপ রাজি হয়।

সুযোগ বুঝে আবারও প্রতারণার ফাঁদ পাতে তোরাব আলী। বসের পরামর্শে লায়লাকে সে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেল করে। একদিন তার বাসায় গিয়ে কাঁদকাঁদ স্বরে বলে, মা অসুস্থ। ঢাকায় আনছি। মায়ে আপনেরে একবার দেখবার চায়। মাত্র একবার।

লায়লা ভেবেছিল, মিচকে শয়তানটাকে সে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে। ছোটলোক টিকটিকি কোথাকার! কিন্তু পারে নি। মায়ের মমতা বলে কথা। যা সে কোনদিন পায় নি। পেয়েছে বাপের অনাদর, অবজ্ঞা, অবহেলা।

সত্যি বলছো ? কী হয়েছে তোমার মায়ের ?

ক্ষয়কাশ আপা, টিবি রোগ। মায় মনে হয় আর বাঁচবে না। নিখুঁত অভিনয় করে তোরাব আলী।

লায়লার মন নিমিষে দ্রব হয়। ভুলেও ভাবতে পারেনি, মাকে নিয়ে নিছক মিছে বলছে তোরাব আলী। বা ম্যানেজার শফিক এখনও তার পেছনে চর লাগিয়ে রেখেছে। এর পরের অংশ সহজেই অনুমেয়। তোরাবের কথায় বিশ্বাস করে লায়লা পৌঁছে যায় সর্বনাশের চরম সীমায়। সে সর্বস্ব হারায়। লম্পট শফিক বাগে পেয়ে তাতে প্রবিষ্ট হয়, তার বিষদাঁত লায়লাকে ফালাফালা করে ফেলে। একপাক্ষিক শিৎকার ঘুমকাতুরে নাগরিক-কানে পৌঁছে না বটে, তবে রাতভর নির্যাতনে শফিকের রিরংসা হয়তো আপাতত মিটে যায়।

পরিতৃপ্ত শফিক নগদ বিদায়ে কার্পণ্য করে না অবশ্য। বরং আশাতীত প্রাপ্তির আনন্দে তোরাবকে সে কুড়ির স্থলে পঁচিশ হাজার টাকার একখানা বাণ্ডিল ছুড়ে দেয়। ক্ষুধার্ত কুকুরের মতো টাকার বাণ্ডিল লুফে নেয় তোরাব আলী। এবং তৎক্ষণাৎ বাসে চেপে শহর ছাড়ে। সে গরিব হলেও বোক নয়। তোরাব অনুমান করে লায়লা তাকে এমনি ছাড়বে না। এই মেয়ের চোখে সে আগুন দেখেছে। এই কেসে থানা-পুলিশ হবে। তাই আগেভাগে গা-ঢাকা দেয়া উত্তম।

তোরাবের অনুমান সঠিক। তবে সে যতটুকু ভেবেছে ঘটনা গড়িয়েছে একটু বেশি। পরদিন খবরের কাগজে এক টুকরো খবর দেখে চমকে ওঠে তোরাব। খবরের শিরোনাম- ‘সম্ভ্রম হারিয়ে সুন্দরী যুবতীর আত্মহনন’।

লোমহর্ষক কেস হিসেবে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে এই মামলার বিচার হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা। তার মানে খেল খতম। পয়সা হজমের টাইম পাবে না শফিক বা তোরাব আলী।

তবে তোরাবের বিচার শুরু হল অন্য আদালতে। ঘরে ফেরামাত্র ওর ছোটবোন ফেলানি প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলল। ফেলানি নিশ্চিত, ওর ভাই তোরাব কোন খারাপ কাজ করে শহর থেকে ভেগে এসেছে।

বল ভাই কী করেছিস ? তুই বেইমানি করেছিস কারো সাথে ! তোকে দেখে এমন লাগছে কেন! ঠিক চোরের মতো লাগছে। এত টাকাই বা কোথায় পেলি!

বোকার মতো ফ্যালফ্যালিয়ে তাকায় তোরাব। ফেলানির চোখকে সে ফাঁকি দিতে পারে নি। বোনটা তাকে হাড়ে হাড়ে চেনে। সেই ছোট্টবেলায় ফেলানির সাথে কত হাসি-গান, খোঁচা-খুনসুটি- কতো কী না করেছে !

রাত বাড়ে। নির্ঘুম জেগে থাকে তোরাব আলী। দুচোখের পাতে বারবার ভেসে ওঠে লায়লার নিষ্পাপ মুখচ্ছবি। নাকি তার ছোটবোন ফেলানির মুখ! কামলোলুপ শ্বাপদের দংশনে বিপন্ন মেয়ের আর্তচিৎকার! লায়লা তাকে বিশ্বাস করেছিল। ভাইয়ের স্নেহে মুখে তুলে দিয়েছে খাবার। আর তার সাথেই কি না-

ছি! ভাবতে পারে না তোরাব। বুকের ভেতরটা অবরুদ্ধ মনে হয়। নিঃশ্বাসে কষ্ট। রাতের অমানিশা লুকোতে পারে না তোরাবের ক্ষীয়মাণ বিবেকবোধ। সবকিছু ছাপিয়ে উঠে আসে ব্যথাদীর্ণ ফেলানির মুখ। তোরাব হারিয়ে ফেলে নিজেকে। নিঃসীম পাপবোধ ছিঁড়েখুঁড়ে খায়। অদৃশ্য বিচারের মুখোমুখি মেয়েছেলের দালাল তোরাব আজ নিঃস্ব এক নপুংশক।

Leave a comment

Advertisement Rupalialo Ads
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement
ফারজানা মিতু
জন্মদিন1 day ago

সাহিত্যিক ফারজানা মিতু-এর জন্মদিন আজ

মা আমার শ্রাবণের আকাশ |
উপন্যাস2 days ago

মা আমার শ্রাবণের আকাশ | মুনীর আহমেদ সাহাবুদ্দিন -এর ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব -০৫

রূপালী আলো2 days ago

বাংলালিংক কর্মীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে ‘এমপ্লয়ি ওয়েলনেস প্রোগ্রাম’

সাহিত্য3 days ago

নাসিম সাহনিকের নতুন বই

পরকীয়ার গল্প নিয়ে লাভ গেম [ভিডিও]
ঘটনা রটনা3 days ago

পরকীয়ার গল্প নিয়ে লাভ গেম [ভিডিও]

কম্বোডিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট | রায়হান আহমেদ
মতামত3 days ago

কম্বোডিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট | রায়হান আহমেদ

ফরিদুজ্জামান-এর গুচ্ছ কবিতা
কবিতা3 days ago

ফরিদুজ্জামান-এর গুচ্ছ কবিতা

বিশ্বজিত রায়- এর গুচ্ছ কবিতা
কবিতা3 days ago

বিশ্বজিত রায়- এর গুচ্ছ কবিতা

মা আমার শ্রাবণের আকাশ | মুনীর আহমেদ সাহাবুদ্দিন -এর ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব -০৪
উপন্যাস5 days ago

মা আমার শ্রাবণের আকাশ | মুনীর আহমেদ সাহাবুদ্দিন -এর ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব -০৪

মিউজিক ভিডিও দ্বিধা দন্দ মডেল : জায়েদ খান এবং সাইমা রুশা
সঙ্গীত6 days ago

মুক্তি পেল জায়েদ খানের নতুন মিউজিক ভিডিও দ্বিধা দন্দ ( ভিডিও সহ )

Advertisement

বিনোদনের সর্বশেষ খবর

মিউজিক ভিডিও দ্বিধা দন্দ মডেল : জায়েদ খান এবং সাইমা রুশা মিউজিক ভিডিও দ্বিধা দন্দ মডেল : জায়েদ খান এবং সাইমা রুশা
সঙ্গীত6 days ago

মুক্তি পেল জায়েদ খানের নতুন মিউজিক ভিডিও দ্বিধা দন্দ ( ভিডিও সহ )

মুক্তি পেল জায়েদ খানের নতুন মিউজিক ভিডিও দ্বিধা দন্দ সঙ্গীত মিউজিকের ব্যনারে ।সিলেটের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী জায়েদ খান পেশায় ডাক্তার...

পূর্ণ ব্যান্ড নিয়ে আসছেন তামান্না জেসমিন পূর্ণ ব্যান্ড নিয়ে আসছেন তামান্না জেসমিন
সঙ্গীত2 weeks ago

`পূর্ণ’ ব্যান্ড নিয়ে আসছেন তামান্না জেসমিন

`পূর্ণ’ ব্যান্ড নিয়ে আসছেন তামান্না জেসমিন শুদ্ধ সঙ্গীতের শূন্যতা যাদের মনে পীড়া দেয় তাদের কাছে এক ধরনের পূর্ণতা নিয়ে আসছেন...

গ্লিটজ2 weeks ago

নতুন দুটি শর্ট ফিল্ম

আল আমিন এইচ রুবেল অভিনয় শিল্পী হিসেবে বিশেষ পরিরচিত। অভিনয় করেছেন মাহফুজ আহমেদ , আপন রানা , নাসিম সাহনিকসহ বেশকিছু...

অভিনয় পাগল তসলিম হাসান হৃদয় অভিনয় পাগল তসলিম হাসান হৃদয়
ফিচার3 weeks ago

অভিনয় পাগল তসলিম হাসান হৃদয়

অভিনয় পাগল তসলিম হাসান হৃদয় এস কে দোয়েল অভিনয় তার নেশা-পেশা। হাসাইতে হাসাইতে হার্টবিট বাড়িয়ে দেয় দর্শকদের। কাজ করেন চট্টগ্রামে...

tamanna-bhatia-bahubali. tamanna-bhatia-bahubali.
বলিউড4 weeks ago

তৈরি হচ্ছেন তামান্না

চরিত্রের চাহিদা মেটাতে নিজেকে নানান ভাবে ভাঙ্গেন গড়েন তারকারা। তবে নিজেকে প্রস্তুত করতে এবার সুদুর ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছেন দক্ষিণের সুন্দরী...

শ্রাবণী পুষ্প। ছবি : সংগৃহীত শ্রাবণী পুষ্প। ছবি : সংগৃহীত
সঙ্গীত4 weeks ago

পুষ্পর সোনা জাদুরে

সময়ের অন্যতম মডেল-অভিনেত্রী শ্রাবণী পুষ্প। সম্প্রতি কাজ করেছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সন্দীপনের গাওয়া ‘সোনা জাদুরে’ শিরোনামের একটি গানের মিউজিক ভিডিওতে। এই...

শাকিব খান (Shakib Khan)। ছবি : সংগৃহীত শাকিব খান (Shakib Khan)। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড4 weeks ago

থাইল্যান্ডে শাকিব খান, রয়েছেন অপেক্ষায়

চিত্রনায়ক শাকিব খান কলকাতার ‘মাস্ক’ ছবির শুটিংয়ে গেল ৪ নভেম্বর উড়াল দিয়েছিলেন থাইল্যান্ডে। এই ছবির শুটিং এর ফাঁকে বাংলাদেশের উত্তম...

চিত্রনায়িকা অধরা খান। ছবি : সংগৃহীত চিত্রনায়িকা অধরা খান। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড1 month ago

অধরার নতুন নায়ক বাপ্পী চৌধুরী

সম্প্রতি ‘নায়ক’ শিরোনামের একটি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হন বাপ্পী চৌধুরী। কিন্তু নায়িকা নিয়ে মনস্থির করতে পারছিলেন না পরিচালক ইস্পাহানি আরিফ জাহান।...

Advertisement

সর্বাধিক পঠিত