Connect with us

গল্প

ছেলেবেলার ঈদ | সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

Published

on

ছেলেবেলার ঈদ | সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

জীবনে ত্রিশটি ঈদ গত হয়ে গেছে। ঈদের স্মৃতি বলতে ছেলেবেলার স্মৃতিই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মধ্যবিত্ত সংসারে ঈদ নিয়ে বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না। অভাবের সঙ্গেই যাদের রোজ দেখা। তাদের তেমন স্মৃতি থাকতে নেই। ফলে নতুন জামা আছে তো প্যান্ট পুরনো। পায়ের স্যান্ডেল জোরাতালি দিয়ে রং মাখিয়ে নতুন করার প্রচেষ্টা। যা ঠিক ঘটা করে উপস্থাপন করা যায় না। যদিও নানার কল্যাণে কোনো কোনো বছর নতুন জামা-প্যান্ট জুটতো। তবুও কীসের যেন অপূর্ণতা থেকে যেত। বাবার প্রতি বড় অভিমান হতো।

ছেলেবেলায় প্রায় প্রতিবছর নানার দেওয়া নতুন পোশাকেই হতো আমাদের ঈদ। নতুন পোশাকের দায়িত্বটা যখন বাবার ঘাড়ে এলো; তখন বড় প্রাপ্তির আশা ছিল না কারোরই। অভাবের বৃহৎ সংসারে জামা হলে প্যান্ট নেই। প্যান্ট হলে জুতা নেই। তাই পুরনো প্যান্ট বা জুতা পরিষ্কার করেই মানিয়ে নিতে হয়েছে কয়েক বছর। পরে অবশ্য নানা-বাবার পর দায়িত্বটি পালন করেন বড়ভাই।বড়ভাইয়ের সীমিত উপার্জনে বৃহৎ সংসারে সবার জন্য সম্পূর্ণ পোশাক জুটতো না।

চাঁদরাতে লাঠিবাজি বা তারাবাজি কিনে আনতেন বাবা অথবা নানা। একটি বাঁশের শলাকার মাথায় বারুদের পোটলা থাকতো বলে তার নাম লাঠিবাজি। আমরা লাঠিটা ধরে শক্ত কিছুর সাথে পোটলাটাকে আঘাত করলে আওয়াজ হতো। আর তারাবাজিতে কোনো আওয়াজ হতো না। আগুন দিলে তারার মতো চারিদিকে আলো ছড়িয়ে পড়তো। এছাড়া জিয়া, মোতালেব ও শফি কাকা ফোটাতো সিগারেট বাজি। সিগারেটের মতো লম্বা একটি বস্তুর মাথায় সুতা থাকতো। সুতায় আগুন দিলে কিছুক্ষণ পর বিকট আওয়াজ হতো।

চাঁদ দেখার আনন্দে আমরা বাজি ফোটাতাম। পাটখড়ি, কাশফুল, শুকনো পাতা দিয়ে বানাতাম ‘বুড়ির ঘর’। সন্ধ্যায় সে ঘরে আগুন লাগিয়ে আনন্দ করতাম। বড় ভাইয়ের নেতৃত্বে মিছিল হতো- ‘হলদি/ চাঁদ উঠছে জলদি’। একটু বড় হলে মেজ কাকা বা ছলেম কাকা কাঠের ওপর মেশিনের প্লাঞ্জার বসিয়ে ‘হাতুড় বাজি’ বানিয়ে দিতেন। হারুন মোল্লার দোকান থেকে গন্ধক আর পটাশ কিনে বাজি ফোটাতাম। ফুফাতো ভাই মোস্তাফিজ ও চাচাতো ভাই আনসার ছিলো বাজির ওস্তাদ। ওরা বিকট আওয়াজের বাজি ফোটালে আমি কানে আঙুল দিতাম।

ডিসেম্বর মাসের কনকনে শীতের ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে বাবা যখন হাসিমুখে আমাদের ঘুম থেকে জাগাতেন, বাবার সেই পবিত্র মুখের দিকে তাকিয়ে সব অভিমান কোথায় যেন চলে যেত। আমরা ভাই-বোনেরা মিলে বাবার সঙ্গে চলে যেতাম নদীর পারে। নতুন কসকো সাবানের ঘ্রাণে কাঁপতে কাঁপতে গোসল করে বাড়ি ফিরতাম। বাবা নিজহাতে আমাদের জামা-কাপড় পরিয়ে দিতেন। সকালের আলো ফুটলেই প্লাস্টিকের ঘড়ি-চশমা পরে বের হতাম। প্লাস্টিকের চশমা পড়ে কখনো সমতল মাটিকেও উঁচু-নিচু দেখতাম। তবুও কত আনন্দ ছিলো তখন।

ছোটবেলায় বিশেষ করে মায়ের হাতের মলিদা ছিলো পরম তৃপ্তির। জামা-কাপড় পরা হলেই তিনি এক গ্লাস মলিদা (নারিকেল, চিনি বা গুড় ও আতপ চালের শরবত) এনে আমার হাতে দিতেন। সকালে শিরনি রান্না করতে যাওয়ার সময় কিছু কিসমিস ধরিয়ে দিতেন আমার হাতের মুঠোয়। কারণ মা জানতেন, এ দু’টো জিনিস আমার খুব প্রিয়।

এরপর গরু কাটা হয়ে গেলে আমরা গামলা ভর্তি মাংস নিয়ে ঘরে ফিরতাম। বাড়ির সাত-আটজন মিলে বড় একটি গরু কিনতেন। কাটাকুটি শেষে সমানভাগে ভাগ করে যার যার অংশ নিয়ে যেতেন। কিছু মাংস দিয়ে প্রতিবছরই সকালে গরুর ভুনা দিয়ে গরম ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন মা। বাবাও কাটাকাটি শেষে রান্নাঘরে এসে মাকে সহযোগিতা করতেন।

এখনো কাজগুলো করছেন। কিন্তু এখন আর সেই ছোটবেলার আমেজটা আমাদের মধ্যে নেই। নতুন জামা নতুনই থাকে। খুব একটা পরা হয় না। সে সবই এখন স্মৃতি মনে হয়। তখন নতুন জামা পরে দলবেঁধে ঘরে ঘরে যেতাম। আমরা তিন-চারজন মিলে (বেশিও হতো) একটি দল হতাম। সকালে থাকতো শিরনি পর্ব। গ্রামের এ প্রান্ত থেকে শুরু করে ওপ্রান্ত পর্যন্ত চলে যেতাম। প্রত্যেক ঘর থেকে এক চামচ করে শিরনি প্লেটে দিতেন। আমরা খেয়ে হাত না ধুয়েই অন্য ঘরে যেতাম। পেট ভরে খাওয়া হলে সবশেষে হাত ধুতাম।

এরপর গরুর গোশতের জন্য বিরতি। সবার ঘরে ঘরে গরুর গোশত রান্না হয়ে গেলে আবার দুপুরের দিকে ছুটতাম দলবেঁধে। প্রতিবছর আমাদের দলে পরিবর্তন আসতো। আমার সমবয়সীদের মধ্যে দুলাল, টোটন, হাফিজ, রাকিব, মাহবুব- আমরা এক দলে থাকতাম। আমাদের একটু বড়দের মধ্যে মেজভাই, মোস্তাফিজ, আবু তালেব, খলিল কাকা মিলে একটি দল হতো। কখনো কখনো আমরা দুটি দল মিলে একদল হয়ে যেতাম।

ঈদের দিন রাতে যেতাম আত্মীয়-স্বজনের ঘরে। এরপরও কোনো ঘর বাদ পড়লে ঈদের পরে দিন গিয়ে হাজির হতাম। এভাবে ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত চলতো অবাধ খাওয়া-দাওয়া। কারণ সবার জন্যই প্রত্যেক ঘরের দরজা থাকতো উন্মুক্ত।

যখন একটু বড় হলাম, মানে নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ি কিংবা স্নাতকে ভর্তি হয়েছি; তখনও ছোটদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতাম। তখন ছোট ভাই-বোনদের হাতে মেহেদি পরিয়ে দেওয়ার দায়িত্বটা ছিলো আমার। চাঁদরাতে বোন আর ভাইটা ঘুরঘুর করতো। ওদের হাতে মেহেদি পরিয়ে দিয়ে নিজেও আনন্দ পেতাম।

যে বছর ঈদে বাড়ি যাইনি- ঢাকাতেই ছিলাম। সকালে মা ফোন করে বললেন, ‘তোমার মলিদা ও কিসমিস ফ্রিজে তুলে রাখলাম। যেদিন আসবে; সেদিন খেতে পারবে। ’ আমার চোখের কোণে তখন চিকচিক করছিল আনন্দ-বেদনা মিশ্রিত অশ্রু। শুষ্ক অনুভূতি কখনো কখনো আর্দ্র হয়ে ওঠে।

এখন বড় হয়ে গেছি। তবুও বাবা সকালেই গোসলের কথা বলেন। নতুন জামা-কাপড় পরলে কেমন লাগবে- তা দেখার জন্য বায়না ধরেন। ‘বাবা আমরা এখন বড় হয়েছি। একটু পরে পরবো।’ ইত্যাদি বলে ফিরিয়ে দেই। বাবা নামাজ শেষে গরুর গোস্ত কাটার বন্দোবস্ত করেন। কখনো সাহায্য করি, কখনো বাবা-কাকা, বড়ভাইদের ওপর চাপিয়ে পালাই।

সত্যি বলতে কী? মানুষ যত বড় হয়; ততই আনন্দ ফিকে হয়ে আসে। বাড়ে দায়িত্ববোধ। সে বোধটা কেমন যেন কঠিন। ছোটবেলার সেই আনন্দবোধের সঙ্গে একে মেলাতে পারি না। মাঝে মাঝে ভাবি, আমি তো বড় হতে চাইনি। ছোটই থাকতে চেয়েছিলাম। অনেক ছোট।

সময় বয়ে যায়। বয়ে চলে মানুষের জীবন। আবেগ-অনুভূতি ফিকে হয়ে আসে ক্রমশ। শুধু থেকে যায় স্মৃতি। তাই স্মৃতিরাই পিছু টানে। কিন্তু সেখানে আর যেতে পারি না। কবির কথা মনে পড়ে। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সে জানতো— সবাই জানে/ শৈশবে আর ফেরা যায় না। ’ সে আমিও জানি। শৈশবে আর ফিরতে পারবো না। তাই তো স্মৃতিটুকু রেখে গেলাম কালির আচড়ে।

তবুও বলব, সবারঈদ কাটুক আনন্দে। কারণ ঈদ মানেই তো আনন্দ। ঈদ মানেই তো খুশি। শৈশব কী যৌবনে- এ আনন্দধারা চির বহমান থাকুক। ছোটবেলার সাথীরা সুখে থাকুক। এখন যারা ছোট- ঈদের খুশিতে ওদের হৃদয়ও ভরে উঠুক কানায় কানায়।!

 

Comments
জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য3 weeks ago

বিতর্কিত জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলের কিছু দুর্লভ ছবি

ঢালিউড2 weeks ago

বাংলা সিনেমার সর্বকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে ঢাকা অ্যাটাক

জান্নাতুল নাঈম
অন্যান্য3 weeks ago

জান্নাতুল নাঈমকে মেয়ে বলে এখন স্বীকার করেন না তার বাবা

যে চার ধরনের মিলন ইসলামে নিষিদ্ধ
রূপালী আলো2 weeks ago

যে চার ধরনের মিলন ইসলামে নিষিদ্ধ

অপু বিশ্বাস ও আব্রাম খান জয়। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড3 weeks ago

কার্ডে জয়ের বাবা হিসেবে শাকিবের নাম ও নাম্বার দেওয়া হয়েছে : অপু বিশ্বাস

জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল ও শবনম ফারিয়া। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য2 weeks ago

জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলকে নিয়ে যে কথা বলে আলোচনায় শবনম ফারিয়া

সুহানা খান
বলিউড2 weeks ago

শাহরুখ কন্যা সুহানার বিকিনি ছবি ভাইরাল

ছবিটিতে লুকিয়ে আছেন একজন নগ্ন মডেল
রকমারি3 weeks ago

ছবিটিতে লুকিয়ে আছেন একজন নগ্ন মডেল

অপু বিশ্বাস ও আব্রাম খান জয়। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড3 weeks ago

ছবিঘরে দেখুন অপুপুত্র আব্রামের প্রথম জন্মদিনের পার্টি

জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য2 weeks ago

পুরুষের সুন্দরী লাগে, তাই আমেনারা ‘এভ্রিল’ হয়

Advertisement

বিনোদনের সর্বশেষ খবর

শুভশ্রী গাঙ্গুলী। ছবি : টুইটারের সৌজন্যে শুভশ্রী গাঙ্গুলী। ছবি : টুইটারের সৌজন্যে
টলিউড55 mins ago

শুভশ্রীর নতুন বার্তা

বিতর্ক এবং শুভশ্রী গাঙ্গুলী যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সাম্প্রতিক ট্রেন্ড সে ইঙ্গিতই দেয়। রাজ চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রেম-প্রেম খেলা পানি ঘোলা...

ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। ছবি : ইন্টারনেট ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। ছবি : ইন্টারনেট
বলিউড2 hours ago

আলোর উৎসবে অন্ধকারে ঐশ্বরিয়া

হিন্দুদের কাছে, দীপাবলি (আলোর উৎসব) একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই দিন সব হিন্দুরা বাড়িতে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বাংলা, আসাম,...

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ছবি : সংগৃহীত মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা4 hours ago

প্যালেস্টাইন অভিনেতাকে নিয়ে ফারুকীর নতুন ছবি ‘স্যাটারডে আফটারনুন’

বাংলা চলচ্চিত্রের শারীরিক ভাষায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এনেছেন ভিন্ন রুপ। এবার তিনি আন্তজার্তিক বিনোদন পত্রিকা ভ্যারাইটিতে নতুন সিনেমার খবর নিয়ে...

মডেল-অভিনেত্রী মেঘলা মিজান। ছবি : সংগৃহীত মডেল-অভিনেত্রী মেঘলা মিজান। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা5 hours ago

‘গিভ অ্যান্ড টেক’ করবেন না তাই মিডিয়া ছাড়ছেন মেঘলা মিজান

অভিনয় জগতে ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ ছাড়া কিছু করা যায় না। আর আমি এভাবে কাজ করতে চাই না। আমি মিডিয়া একেবারে...

চিত্রনায়িকা অধরা খান। ছবি : সংগৃহীত চিত্রনায়িকা অধরা খান। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড6 hours ago

আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আসছেন গ্ল্যামার গার্ল অধরা খান

রোহিঙ্গা জনগণদেরকে “পৃথিবীতে সবচেয়ে কম প্রয়োজন বোধ করা” এবং “সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের মধ্যে অন্যতম” বর্ণনা করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মুক্তভাবে...

মাহিয়া মাহি। ছবি : সংগৃহীত মাহিয়া মাহি। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা6 hours ago

ফালতু নিয়ে বেকায়দায় মাহিয়া মাহি

‌’ঢাকা অ্যাটাক’ তুমুল আলোচিত একটি ছবি। কিন্তু নায়িকা হিসেবে মাহিয়া মাহি নামের প্রতি খুব একটা সুবিচার করতে পারেননি। যতটা আলোচিত...

আরো দুটি ছবিতে মুন্না আরো দুটি ছবিতে মুন্না
ঢালিউড20 hours ago

আরো দুটি ছবিতে মুন্না

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মুন্না চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা থেকে নির্মান করেছেন ছবি। “ধূসর কুয়াশা” নামে তার প্রথম ছবি এতে তিনি গল্প ভাবনার...

নতুন পরিচয়ে প্লাবন কোরেশী নতুন পরিচয়ে প্লাবন কোরেশী
অন্যান্য21 hours ago

নতুন পরিচয়ে প্লাবন কোরেশী

সবাই তাকে একজন গীতিকবি ও সুরকার হিসেবেই চেনেন। গান লিখছেন প্রায় দুইযুগেরও বেশি সময় ধরে। তার লেখা গানে কণ্ঠ দিয়ে...

সর্বাধিক পঠিত