Connect with us

গল্প

বাঘের বন্ধু বানর | ফয়সাল শাহ

Published

on

বাঘের বন্ধু বানর | ফয়সাল শাহ

এক
সুন্দরবনের কেওড়া বনে এক ডাল বেয়ে অন্য ডালে লাফালাফি করতে গিয়ে হঠাৎ হাত ফসকে বানরটি মগডাল থেকে মাটিতে পড়ে গেল । বনের মধ্যে প্রায় অজ্ঞাত অবস্থায় পড়ে আছে । ঐ সময় একটি বাঘ ঐ পথ ধরে যাচ্ছিল। বাঘটি অবাক হয়ে দেখল হঠাৎ বানরটির কি হল? বনে এর আগে একটি বানর এভাবে পড়ে থাকতে সে কখনো দেখেনি। কাছে গিয়ে বানরের বুকে কান পেতে বাঘটি অনুভাব করলো হৃৎপিন্ড এখনো সচল আছে । বানরটি মারা যায়নি । বাঘটির মায়া হল বানরটিকে বাঁচাতে হবে । পাশের খাল থেকে মুখে করে পানি এনে বানরের নাকে মুখে ছিটাতে লাগল।

কিছুসময় পর বাঘটি ল্য করল বানরটি আস্তে-আস্তে নড়ে উঠছে এবং চোখ খুলছে। বাঘের মনের আশা জাগলো বানরটি কে বাঁচানো যাবে । বিলম্ব না করে বাঘ বানরের লেজ কামড় দিয়ে ধরে পাশের খালে পানিতে ডুবিয়ে আবার উঠলো । বানরের নাকে মুখে পানি প্রবেশ করতে একটু হাচি দিল এবং লাফিয়ে উঠলো। তারপর বানরটি কে ডাঙ্গায় নিয়ে গেলো । ততণে বানরের জ্ঞান ফিরলো। সামনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগলো । এই বুঝি বাঘ তার ঘাঢ় মটকে খাবে । বানরের ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থা দেখে বাঘ আশ্বস্থ করে বলল, আমি তোকে খাবনা, আজ থেকে তুই আমার বন্ধু । এতণে বানরের গলায় পানি এলো এবং গা ঝাড়া দিয়ে শরীরের পানি ঝেেেড় ফেলে দিল।

বাঘ বলল চল আমার সাথে । তোর খাবারের ব্যবস্থা করি । বানর বলল আমার গায়ে ব্যথা হচ্ছে হাটতে পারব না। বাঘ বলল ঠিক আছে তুই আমার পিঠে চড়ে বস। আমি তোকে নিয়ে যাচ্ছি । বাঘ মাটিতে সটান হয়ে বসল । বানরটি আস্তে আস্তে বাঘের পিঠে বসে সামনে দুই পা দিয়ে বাঘের গলা জড়িয়ে ধরল। বাঘ হেটে হেটে গোলপাতার ঝোঁপে নিয়ে বানরকে ফলের রস ও গাছের রস খাওয়ালো। আস্তে আস্তে বানরের শরীরে শক্তি ফিরে এল এবং শরীরে ব্যথা কমতে লাগল। কতন পর বানর বলল বাঘবন্ধু আমি এখন নিজে নিজেই হাটতে পারব। এই বলে হাটতে লাগল। হাটা দেখে বাঘ বলল তুই দেখছি ভালভাবেই হাটছিস এখন একটা ডিগবাজী খেতে পারবি । বানর বলল না সাহস হচ্ছে না তবে শরীরে আর শক্তি হলে তোমাকে ডিগবাজী দেখাবো। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, দু’জনে যার যার ঘুমানোর স্থনে চলে গেল ।

সে রাতে বানরের ঘভীর ঘুম হলো। পরের দিন দুপর একটায় বানরের ঘুম ভাঙল। এদিকে ুধার জ্বালায় বানরের পেটে চো চো করতে লাগল। বনে ঘুরে কিছু ফল খেয়ে নিল । সারাদিন সে বিশ্রাম করেই কাটাল । পরের দিনে বানর বন্ধুর খোঁজে বের হল। হঠাৎ গোলপাতার ঝোপে তাদের দেখা হলো । বাঘ বলে উঠল কিরে দোস্ত তোর শরীর কেমন আছে । বানর বলল আজকে শরীরটা খুব খারাপ লাগছে ।

বাঘ বলর চল তুই আমাকে একটা হরিণ খাওয়ার ব্যাবস্থা কর । দু’জনে মিলে বুদ্ধি করে কিভাবে হরিণ শিকার করা যায় । বানরটি বাঘকে বলল দোস্ত তুমি পাশের গোলপাতার ঝোঁপে ওৎপেতে বসে থাক, দেখ আমি কি করছি । এই বলে বানর একলাফে কেওড়া গাছের মগডালে উঠে পরল । কতণ পর গলা হাকিয়ে কেচ কেচ কিচির কিচির শব্দ করতে লাগল । ডাগ শুনে একপাল হরিণ কেওড়া গাছের তলায় জড়ো হল। বানর কেওড়া গাছের পাতা ছিড়ে ছিড়ে নিচে ফেলতে লাগল।

এদিকে গোলপাতার ঝোঁপে থেকে বাঘ একটি হরিণকে নিশানা করল। হরিণগুল যখন খাওয়াতে মগ্ন , তখন পা টিপে টিপে বাগটি সামনে এগুতে লাগল। হরিনগুলর প্রায় কাছা কাছি এসে হঠাৎ একলাফ দিয়ে একটি বড় হরিণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গলায় দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল । হরিণটি সর্বশক্তি দিয়ে বাচার জন্য ছপফট করতে লাগল। এদিকে অন্য হরিণগুলো প্রাণভয়ে দৌড়ে পালাল । এতণে বাঘ হরিণটিকে কাবু করে কামড়ে কামড়ে শরীরের চামরা ছিড়ে মজা করে খেতে লাগল। ততণে বানরটি কেওড়া গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে বাঘের হরিণ শিকার দেখছিল । আস্তে আস্তে বাঘের কাছে এসে বসল । কতণ পর বানর বলল বন্ধু, আমি তো হরিণের মাংস খাইনা, তবে তোমার খাওয়া দেখে আমার লোভ হচ্ছে । বাঘ বলল ইচ্ছে করলে তুই কয়েক টুকরা মাংস খেতে পারিস । বানর মনে মনে চিন্তা করতে লাগল হরিণের মাংস জীবনে কোন দিন খাই নি, আর খাবইবা কেমন করে । পুচকি বানর হয়ে হরিণ শিকার করব কেমনে । এবার বাঘ বন্ধু হওয়াতে একটু সুযোগ এল হরিণের মাংস খাওয়ার । বানর লোভ সামলাতে না পেরে বাঘের মুখ থেকে এক টুকরো মাংস নিয়ে খেল । বানরের একটা ঘিন্না ঘিন্না লাগছিল, তবে খেতে মন্দ লাগেনি।

এতণে বাঘ হরিণের অর্ধেক খেয়ে পেট ভরে ফেলল। বানরকে বলল আগামীকাল বাকি অর্ধেক খাব, তুই পাহারা দিবি কেউ যেন খেতে না পারে । ঘুমাতে না পারলে মাংস হজম হবে না, আমি ঘুমাতে যাই এই বলে বাঘটি চলে গেল। বানর দূরে বসে পাহারা দিচ্ছিল। হঠাৎ একটা বনবিড়াল হরিণের মাংস খেতে শুরু করল । বানর প্রথমে তা দেখেনি, দেখামাত্র এক লাফ দিয়ে বন বিড়ালকে থাপ্পর মেরে খামচি দিয়ে তাড়িয়ে দিল। হরিণের মাংস খেয়ে বানরের এখন কেমন যেন বমি বমি ভাব হচ্ছে ও ঢেকুড় উঠছে। যতই সময় যেতে যেতে লাগলো এক সময় মনে হচ্ছে পেট ফুলে যাচ্ছে। বানর বুঝল জীবনে প্রথম হরিণের মাংস খাওয়াতে এ অবস্থা হচ্ছে। রাত যতই বাড়তে লাগলো বানরের পেট ব্যথা ততই বাড়তে লাগলো । গভীর রাতে পাশ দিয়ে একটা সজারু যাচ্ছিল, বানরের কাতরানো দেখে সজারু জিজ্ঞেসা করলো কি হয়েছে । বানর বলল জীবনের প্রথম একটুকরা হরিণের মাংস খেয়ে এ অবস্থা হয়েছে। সজারু বলল চিন্তা নাই তুই অপো কর আমি আসছি এই বলে চলে গেল । কতণ পরে কয়েক টুকরা গাছের শিকড় এনে বানরকে খেতে দিল। হঠাৎ ওয়াক করে বানর বমি করে পেটের মাংস বের করে দিল । তারপর বানর আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলো । ইতিমধ্যে ভোর হয়ে এল। সারারাত গুমাতে না পারায় বানরের ঘুম পেল এবং ঘুমিয়ে পড়ল। বন বিড়ালটা পাশে পাশেই ছিল । যখন দেখল বানরটা ঘুমিয়ে পড়েছে তখন দলবলসহ হরিণের মাংস পেট পুরে খেয়ে নিল । বানরের গভীর ঘুমে মগ্ন সারাদিন কেটে গেল । বানরের ঘুম ভাঙ্গছে না । সন্ধ্যায় বানরের ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠে দেখে হরিণের মাংস বনবিরাল খেয়ে ফেলছে । বানর চিন্তায় পরে গেল এখন বাঘ বন্ধকে কি জবাব দিবে। বানর চিন্তা করল কয়েকটা দিন লুকিয়ে থাকবে। আবার যখন বাঘের সাথে দেখা হবে তখন একটা জবাব দেবে।

 

দুই
সাতদিন কেটে গেল । বানর চিন্তা করল আর লুকিয়ে না থেকে বাঘ বন্ধুর সাথে সাাৎ করা দরকার । বাঘ বন্ধু ছাড়া এ সাতদিন বানরের ভাল লাগছে না । ইচ্ছে করে সাতদিন পর গোল পাতার ঝোপের পাশে দেখা করল। বানরকে দেখে বাঘ রাগে কটমট করে জিজ্ঞেস করলো কিরে বান্দর তুই আমার হরিণ কি করছিস, আর এ সাতদিন কোথায় পালিয়ে ছিলি। বানর কাঁচুমাঁচু করে মাপ চেয়ে সত্য কথা বলতে শুরু করলো । আমি সেদিন এক টুকরা হরিণের মাংস খাওতে পেটে ফুলে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হচ্ছিল। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি । এক সাজারু গাছের শিকড় খাইয়ে আমাকে সুস্থ করেছিল। সারারাত অসুস্থতার জন্য ঘুমাতে না পারায় আমি ঘুমিয়ে পরছিলাম । সুযোগ পেয়ে বনবিড়ালগুলো হরিণের মাংস খেয়ে শেষ করে ফেলছে। জেগে দেখি হরিণেন হাড্ডিগুলো পড়ে আছে। আমি মনে মনে ভয় ও লজ্জা পাই। এখন বাঘ বন্ধুকে কি জবাব দেব। তাই ইচ্ছা করে কয়েকদিন গাঢাকা দিয়েছিলাম । বানর সত্য কথা বলাতে বাঘ খুব খুশি হয়ে বানরকে মাফ করে দিল এবং বানরকে জরিয়ে ধরে আদর করল। বানর আহাদে আপ্লুত হয়ে বলল বন্ধু আমি এখন তোমাকে একটা হরিণ খাওয়াচ্ছি।

এই বলে বানর বাঘকে পাশের কেওড়া বনে নিয়ে গেল। এখনে হরিণের আনাগোনা বেশি । বাঘকে পাশের গোলপাতা ঝুঁপে লুকিয়ে থাকতে বলে বানর এক লাফে কেওড়া গাছের মগ ডালে উঠে গেল। গলা চেচিয়ে বানর কে কে করতে লাগলো। কতণ পরে এক ঝাঁক হরিণ চলে এল এবং কেওড়া পাতা খেতে লাগলো । বাঘ গোলপাতার ঝোঁপ থেকে দেখল তিনটা হরিণ আছে একঝাঁক হরিণে। একটিকে নিশানা করে বাঘ পা টিপে টিপে কাছে এসে এক লাফে বড় হরিণটিকে থাবা দিল। থাবা খেয়ে হরিণটি পড়ে গেল আবার লাফ দিয়ে উঠল, বাঘ আরেকটি থাবা দিয়ে মাটিতে ফেলে গলা কামড় দিয়ে কাবু করে ফেলল। এবার আস্তে হরিণটি বাঘ পেট পুরে খেল। এবার বানর কোন হরিণের মাংস খায়নি ।

পরের দিন আবার বাঘের সাথে বানরের দেখা হলো। বানর বাঘকে বলল দোস্ত, আমার জীবনে সারা সুন্দরবনে গাছের মগডাল থেকে শুরু করে সমস্ত বন চষে বেড়িয়েছি, ইচ্ছামত যখন যে গাছে চড়া দরকার সে গাছে উঠেছি । কিন্তুু আমার মনে একটা শখ ছিল ঘোড়ার পিঠে উঠে ঘোড়-দৌড় দেয়া । বাঘ বলে উঠল আরে বন্ধু এ সুন্দরবনে ঘোড়া পাবি কোথায়? এখানে বন্য ঘোড়া বা পোষা ঘোড়া কিছুই নেই । তবে একটা বুদ্ধি আছে আমি তোর মনের আশা পূরণ করতে পারি । বানর উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল কিভাবে । বাঘ বলল আরে বুদ্ধি আছে । বানরের আগ্রহ আরো বেড়ে গেল । বাঘ বলল তুই অমার পিঠে চড়ে শক্ত করে ধরে বসবি আমি ঘোড়ার বেগে দৌড়াব । তুই দেখবি বাঘ দৌঁড় ঘোড়া দৌড় থেকে কি মাজা ! বানর বলল তাহলে কবে বাঘ দৌড় দিবে । বাঘ বলল তুই অগামী পরশু বিকেলে কটকা বিচে আসবি বলে দু’জন দু’দিকে চলে গেল।

বানর কথামত বিকালের দিকে কটকা বিচে এসে হাজির। কতণ পর বাঘ এল। এবার বাঘ বলল দোস্ত তুই আমার পিঠে উঠে বস। বানর এক লাফে বাঘের পিঠে উঠে বসল। কিস্তু বানর বাঘের পিঠে বসে সুবিধামত বসতে পারেছে না। তাই বাঘ বলল তুই অমার ঘারে বসে পিছনের দুই পা দিয়ে গলায় জড়িয়ে ধর আর সামনের দুই পা আমার কানে শক্ত করে ধরে বস। বানর তাই করল । এবার বাঘ ওয়ান, টু, থ্রি বলে দৌঁড় শুরু করলো, কটকা বিচ ধরে পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে । ধীরে ধীরে বাঘ দৌঁড়ের গতি বাড়াতে লাগল। বানর শক্ত করে বাঘের কান ধরে বসে রইল । বানরের ভয় হচ্ছিল এই বুঝি ছিটকে পড়ছে । আবার মনে হচ্ছিল মহাশূন্যে সে ভাসছে অর শু-শু বেগে বাতাস তার কানের পাশে দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। একটু পরে বলল বানর, বন্ধু আমার খুব মজা হচ্ছে। বাঘ একটা ধমক দিয়ে বলল-আমি হাপাচ্ছি আর তুই মজা করছিস।

বাঘ দৌড়ানোর সময় কথা বলাতে হঠাৎ বিচে পড়ে থাকা একটা মস্ত কচ্ছপের গায়ে পা পিছলে বাঘ তিন ডিগবাজি খেয়ে দশ হাত দূরে ছিটকে পড়ল। আর বানর দশ পুলটি খেয়ে তিরিশ হাত দূরে চিৎপটাং হয়ে পড়ে রইল। এদিকে বাঘ আর বানর দু’জনেই বিচের বালিতে পড়ে কাতরাচ্ছে। কতণ পর একটা বনবিড়াল এসে দেখে বানর বনবিড়ালকে একটু পানি পান করানোর জন্য অনুরোধ করল কিন্তু বনবিড়াল একটা ভেংচি কেটে বলল-তুই সে দিন আমাকে হরিণের মাংস খেতে দিসনি। আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলি। তোকে পানি দেব না এখন বুঝ কেমন লাগে, এই বলে বানরকে লেজ দিয়ে একটা বারি মেরে চলে গেল বনবিরালটা । এদিকে পিপাসায় বানরের প্রাণ বেড়িয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে একটা কাঠবিড়ালী এল, সেও বানরকে একটা বকা দিয়ে চলে গেল। বানরের জন্য কাঠবিড়ালী বনে পেটপুরে ফলমূল খেতে পারত না ।

বানরের কাতরানো শুনে পরে একটা বন্য কুমির এল, বানর তাকে কাকুতি মিনতি করে পানি পান করানোর জন্য অনুরোধ করতে লাগল। বানরের কষ্ট দেখে কুমিরের একটু মায়া হল । বানরকে একটু অপো করার জন্য বলে সে পানি আনতে গেল। পাশেই সমুদ্র থেকে মুখে করে পানি এনে বানর কে পান করাতে লাগল। পানি পান করে বানর একটু চাঙ্গা হয়ে উঠল। এদিকে বাঘের অবস্থা বেগতিক, সে কাতরাচ্ছে কিন্তু ভয়ে কেউ তার কাছে যাচ্ছে না । বানর কুমিরকে বলল ঐ দেখ দূরে আমার বাঘ বন্ধু পিপাসায় কাতরাচ্ছে তাকেও পানি পান করাতে হবে কুমির জিজ্ঞেস করল তোমাদের দু’জনের এ আবস্থা কি করে হলো, বানর বাঘ-দৌঁড়ের বিস্তারিত ঘটনা ঘুলে বলল।

কুমির এবার বলল আমি বাঘের কাছে যেতে পারব না, আমার ভয় হচ্ছে। বানর বলল ভয়ের কোন কারন নেই, বাঘ আমার খুব ভাল বন্ধু তোমাকেও বন্ধু বানিয়ে দেব এই বলে বানর খুঁড়িয়ে খুঁিড়য়ে কুিমরকে নিয়ে বাঘের দিকে এগিয়ে গেল। বাঘ, বানর ও কুমিরকে দেখে হা করে পানি পান করানোর জন্য ইশারা করল। বানর কুমিরকে বলল তুমি আজ থেকে অমার ও বাঘের বন্ধু চল আমরা বাঘের জন্য পানি নিয়ে আসি এই বলে দু’জনে সমুদ্র থেকে মুখে করে পানি এনে বাঘকে পান করাল । পানি পান করে বাঘ সুস্থ হয়ে উঠল। বানর বাঘের কাছে কুমিরের সাহায্যের কথা বলল এবং কুমিরকে তাদের বন্ধু হিসাবে পরিচায় করে দিল।

কুমির একটু সময় নিয়ে বাঘ ও বানরের জন্য গাছের শেকড় ফলের রস নিয়ে এল। তা খেয়ে বাঘ ও বানর সুস্থ হয়ে উঠল। এভাবে প্রায় তিন-চারদিন কুমির আর বানর বাঘের সেবা- যত্ন করে সুস্থ করে তুলল। তারপর থেকে বাঘ, বানর আর কুমির সুন্দরবনে মহা-আনন্দে দিন কাটাতে লাগল। তিনজন একে অপরের সহযোগিতায় বনের সকল পশু পাখির বিপদে-আপদে সাহায্যের হাত বাড়িযে দিতে লাগল। এভাবে তিন বন্ধুর সুনামের কথা সারা সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ল। আর সুন্দরবনের সকল পশু পাখি মিলে বাঘকে রাজা, বানরকে উজির আর কুমির কে সেনাপতি বানিয়ে সুন্দরবনের শাসনভার তাদেরকে দিয়ে দিল। তিনজন মিলে সুন্দরবনে সুশাসন কায়েম করল। সকল পশু পাখি মহাসুখে বসবাস করতে লাগল। বানর উজির দৈনন্দিন বনরাজ্যের শাসন কাজ চালাতে লাগল।

তিন
সুন্দরবন বনরাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করার পর বাঘ রাজা অর বন্ধু বানর উজিরের দায়িত্ববোধ বেড়ে গেল। দু’বন্ধু পরামর্শ করতে লাগল কিভাবে সুন্দারবনের পশু-পাখি সম্পন্ন বনরাজির দেখভাল সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করা যায় । আর সকল প্রাণী মিলে আমাদের যে মহান দায়িত্ব প্রদান করছে তা পালন করতে না পারলে আমাদের ইজ্জ্বত থাকবে না, বনে কাউকে মুখ দেখাতে পারব না, সুন্দরবন ছেড়ে পালাতে হবে। বানর বলল তুমি কি আবল তাবল বলছ আমরা যদি দায়িত্বে সচেতন থাকি এবং সৎভাবে সকলে মিলেমিশে সুশাসন বজায় রাখতে পারি তা হলে সকল প্রাণী আমাদের আজীবন মাথায় তুলে রাখবে আমাদের লজ্জাও পেতে হবে না সুন্দরবন ছেড়ে পালাতেও হবে না।

বানর বন্ধুর পরামর্শে জীববৈচিত্র রা ও সুন্দরবনের সার্থে যথারীতি বাঘ বানরে সকল প্রাণীদের নিয়ে একটি সভার দিন ঠিক করল। আর স্থান নির্ধারণ করা হলো সুন্দরবনের দণি পার্শে ঘেঁষে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন কটকা সমুদ্র সৈকত । যথারীতি সারা সুন্দরবনের বানরের দল ঢোল পিটিয়ে মহারাজা বাঘের সভা আহব্বানের কথা সকলকে জানিয়ে দিল। বাঘ রাজার শাহী ঘোষণায় যথারীতি বনের সকল পশু-পাখি সরীসৃপ বিকেলে কটকা সৈকতে হাজির হল। বানর উজির প্রথমে উপস্থিত সকল প্রাণীর সুস্বাস্থ্য কামনা করে সভার কার্যক্রম শুরু করল। সভার প্রারম্ভে বানর সকলকে জানাল মহারাজা বাঘ সকল প্রাণীকে ডেকেছেন একটি মহত উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে । সুন্দরবনের উক্ত মহাসম্মেলনে ছিল, বাঘ, বানর, শুকর, বনবিড়াল, উদ, সজারু, হরিণ, কুমির, সাপ, মৌমাছি, বনমোরগ, বক, কাক, চিল, টিয়া, ফিঙে, শামুক, ঝিনুকসহ অনেক প্রাণী।

বাঘ রাজা যথারীতি সভার সকল প্রাণীর উদ্দেশ্যে বক্তৃতা শুরু করল। বাঘ বলতে লাগল, সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতীর গাছ-পালা, পশু পাখি আঁকা-বাঁকা খাল রয়েছে। যুগযুগ ধরে সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্য সুষ্ঠুভাবে প্রাকৃতিকভাবে সংরতি হয়ে আসছে। আমাদের জীবন ধারনের কোন সমস্যা হচ্ছিল না। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে মানব জাতি পরিবেশ দূষণ করে বনের গাছ পালা কেটে ও পশু-পাখি নিধন করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দ্বারাপ্রান্তে নিয়ে গেছে। বনরাজ্যের অধিকর্তা হিসাবে নিজ দায়িত্ববোধ থেকে আজকের এ সম্মেলন ডেকেছি এবং আপনাদের সুচিন্তিত পরামর্শের প্রয়োজন। বাঘ রাজা এ কথা বলে উপাস্থত প্রাণী থেকে পরামর্শ আহব্বান করল।

বাঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এক পুচকে কাঠবিড়ালী তার বক্তব্য শুরু করল। কাঠবিড়ালী বললো মহারাজা আপনি জানেন সারা পৃথিবীতে মানুষের বিভিন্ন বন জঙ্গল থেকে আমাদের বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী শিকার করে তাদের চামড়া, হাড় ও মাংস দিয়ে ব্যবসা করছে। এই ভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক চিড়িয়াখানাতে বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণীকে বিনা অপরাধে আটকে রেখে, বিনা অপরাধে বন্দী রেখে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়ে রেখেছে আর অমাদের প্রাণী জগতকে হেয়প্রতিপন্ন করছে। আমাদেরকে মানুষেরা পশু বলে তাচ্ছিল্য করে । পৃথিবীর সঠিক পরিবেশের ভারসাম্য রার্থে আমাদের যে সরাসরি অবদান আছে তা অস্বীকার করে আমাদের তি করে তাদের ধ্বংস ডেকে আনছে। মহারাজা এ পৃথিবীতে বসবাস করার অধিকার যেমন মানুষ জাতির রয়েছে, প্রাণী হিসাবে আমাদেরও একই অধিকার রয়েছে। আমরা প্রাণীরা যত না মানুষের তি করি মানবজাতি তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের তি করছে ।

কাঠবিড়ালীর এ বক্তব্য শুনে একটি কুমির দাঁড়িয়ে সম্মেলনে বলতে শুরু করল, মহারাজা আজকে মানবজাতি পরিবেশ দূষণ করে, বন জঙ্গল ধ্বংস করে এবং পশু-পাখি নিধন করে পৃথিবী নামক গ্রহটিকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে, তা এখনই প্রতিরোধ না করলে সকলের জন্য মহাবিপদ অপো করছে । এই বলে কুমির সম্মেলনে একে একে প্রস্তাব পেশ করতে লাগল। কুমিরের প্রস্তাবাগুলো হচ্ছে, সারা পৃথিবীর সকল চিড়িয়াখানার প্রাণীদের মুক্ত করে তাদেরকে সাফারী পার্ক স্থাপন করে সেখানে ছেড়ে দিতে হবে এবং এ সকল প্রাণীর খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে মানবজাতি, আর এ সকল সাফারী পার্কে এসে মানুষেরা মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাণীজগৎ দেখে বিনোদন করবে আর কোন মানুষ যদি আমাদের কোন বন্য প্রাণী হত্যা করে তা হলে মানুষ হত্যা করার যে শাস্তির বিধান রয়েছে তা প্রবর্তন করতে হবে। এ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে যে পরিমান বনজঙ্গল ধ্বংস করা হয়েছে, পুনরায় তা ফিরিয়ে দিতে হবে।

মানবজাতি সভ্যতার নামে, উন্নয়নের ল্েয প্রকৃতিতে যেভাবে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে পরিবেশে ধ্বংস করছে। তাও প্রতিরোধ করতে হবে। আজকের এ সম্মেলনের সকল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মত যেহেতু এককভাবে আমাদের নেই, তাই তা অচিরেই মানবজাতির যে সংঘ জাতিসংগ রয়েছে সেখানে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে । কাঠবিড়ালী ও কুমিড়ের বক্তব্য সম্মেলনে উপস্থিত সকল প্রাণী মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করল এবং সমর্থন দিল। ইতোমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে এল। বাঘ রাজা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করল। সুন্দরবনের প্রাণীদের মহাসম্মেলনের সংবাদ ইতোমধ্যে মানবজাতির কাছে পৌছে গেল। তাই কিছুদিন আগে রাশিয়াতে আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলন হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে মানবজাতির নিজেদের এ পৃথিবীতে অস্তিত্ব রার্থে জীববৈচিত্র সংরণের উপর গুরুত্ব দিতে বাধ্য হচ্ছে।

 

সুন্দরবনে কটকা সমুদ্র সৈকতে বাঘ রাজার মহাসম্মেলন শেষ হয়েছে প্রায় এক বছর হয়ে এলো। সুন্দরবনের সকল প্রাণীদের এ সম্মেলণের আরজী ও সিদ্ধান্ত মোতাবেক ইতোমধ্যে মানবজাতি পরিবেশ ও প্রাণী রার্থে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সকল প্রকার প্রচেষ্টা শুরু করেছে।

এদিকে বাঘ রাজা ও বানর উজিড়ের রাজত্বে সুন্দরবনের সকল প্রাণী মহাসুখে দিন কাটাচ্ছে। আর বাঘ বানর যথারীতি অন্যান্য প্রাণীদের পরামর্শে তাদের শাসনকার্য পরিচালনা করছে। একদিন সারা সুন্দরবনে হৈ চৈ পড়ে গেল। সকল তৃণভোজী প্রাণী বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে বাঘ রাজা ও বানর উজিড়ের সু-নজর ও ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায়। আর তৃণভোজী প্রাণীদের বিদ্রোহের কারণ তারা সুন্দরবনে অসহায় নিম্নশ্রেণীর দূর্বল প্রাণী তাদের সবল মাংশাসী প্রাণীরা হত্যা করে খেয়ে ফেলে এতে করে তাদের অধিকার ুন্ন হচ্ছে। যথারীতি বাঘ রাজার কানে এ সংবাদ পৌঁছে গেল।

বাঘ রাজা বানর উজিড়কে ডেকে জিজ্ঞেস করলো এখন কি করা যায়। তাদের বিদ্রোহের কারণ সঠিক আমার রাজত্বে নীরিহ তৃণভূজী প্রাণীরা মাংশ্বাসী প্রাণী কর্তৃক হত্যার শিকার হবে তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। প্রয়োজনে আমিও মাংস খাওয়া ছেড়ে দেব।

বানর বলল মহারাজ বুদ্ধি একটা আছে, সুন্দরবনের পাশে লোকালয়ে কিছু শিয়াল বসবাস করে তাদের মাথায় অনেক বুদ্ধি। আপনি যদি আদেশ করেন তবে তাদেরকে এ সুন্দরবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে বুদ্ধি নেয়া যেতে পারে। বাঘ যথারীতি বানরকে হুকুম করল যথাশীঘ্র শিয়ালদের তার দরবারে হাজির করা হোক। বাঘের আদেশমত বানর উজিড় শিয়ালদের আমন্ত্রণ জানিয়ে গোলপাতায় একটি চিঠি লিখে তিনটি বানরকে পাঠিয়ে দিল।

বানর উজিড়ের চিঠি নিয়ে তিনটি বানর লোকালয়ের জঙ্গলে শিয়ালদের খোঁজতে লাগল। তিন রাত তিন দিন পর তিনটি শেয়ালের দেখা মিলল, বানর উজিরেরচিঠি তাদের হাতে দিয়ে বিস্তারিত বিষয় তিন বানর বর্নণা করল। আমন্ত্রণপত্র পাঠ করে তিন শিয়াল সুন্দরবনে বাঘের দরবারে যেতে রাজি হয়ে গেল। তিন বানর ও তিন শিয়াল দুটি গাধার পিঠে চড়ে সুন্দরবনের আঁকা-বাঁকা পথ ও খাল-নদী পাড়ি দিয়ে তিনদিন পর বাঘের দরবারে হাজির হলো।

বাঘের আদেশ মোতাবেক তিন শিয়ালকে সাতদিন ধরে ভূরিভোজসহ সারা সুন্দরবন ঘুরে দেখানো হলো। আর এই সতদিন শিয়ালদের বনমোরগের মাংসের ফ্রাই, রোষ্ট, কুমিরের ডিমের পুডিং, মধু, হরিণের দুধসহ অনেক সুস্বাদু খাবার খাওয়ানো হলো। সুন্দরবনে বাঘ রাজার আথিতেয়তা পেয়ে তিন শিয়াল ও গাধাদুটি মহা খুশী, বাঘ রাজাকে সর্বাত্বক সহায়তা করার জন্যে তারা মনস্থির করল।

সাতদিন মজা করে খাবার ও সুন্দরবন ভ্রমনের পর তিন শিয়ালকে বাঘ রাজার দরবারে হাজির করা হলো। বাঘ রাজা তাদের গোলপাতার সোফাতে বসতে দিল। বানর উজির তাদেরকে বাঘ রাজার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। পরিচয় পর্ব শেষে বাঘ রাজা তিন শিয়ালের উদ্দেশ্যে সুন্দরবনে তৃনভোজী প্রাণীদের সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করল। তিন শিয়ালের মধ্যে কানকাটা শিয়ালটা বলল মহারাজ অপনার এ সমস্যা অত্যন্ত জটিল, কারণ এ সুন্দরবনে যুগযুগ ধরে মাংশসী প্রাণী যেমন বাঘ, বনবিড়াল, কুমীর, সাপ, ঈগল এরা অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণী যেমন, হরিন, বানর, শুকর, বনশোকর, ডলফিন, মাছ, ইদুর ইত্যাদি খেয়ে জীবন ধারন করছে। প্রকৃতিগত ভাবেই তাদের এ খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠেছে, হঠাৎ করে তারাতো মাংস ছাড়া অন্য কিছু খেলে পেটের পীড়ায় সকলে মারা যাবে। তবে বুদ্ধি একটা আছে, সে জন্যে আপনাকে ছয়মাস থেকে এক বৎসর পর্যন্ত অপো করতে হবে। বাঘ রাজা ও বানর উজির উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল কি সে বুদ্ধি।

লেজকাটা শেয়াল বলল মহারাজ আমাদেরকে আরো সাতদিন সময় দিতে হবে, এ সাতদিন আমরা তিনজনে মিলে বুদ্ধিটা পাকাপুক্ত করে আপনাকে জানাচ্ছি। আপনার কোন চিন্তা নেই আমরা এর একটা যথার্থ বুদ্ধি আপনাকে বাতলে দেব এই বলে তারা সুন্দরবন ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। বাঘ রাজার নির্দেশ মত তিন শিয়াল পশুর নদীতে এক কুমিরের পিঠে চড়ে বসল। কুমির সুন্দরবনের আঁকা-বাঁকা খাল ধরে হারবারিয়া, কুকিলমনি, চরাপুঠিয়া হয়ে হিরন পয়েন্টে পৌছে গেল। সেখানে কিছুণ ঘুরাফেরা করে আবার কুমিরের পিঠি চড়ে দুবলার চরে গিয়ে পৌঁছালো। সমুদ্রের বুকে দুবলার চরে পৌছে তিন শিয়ালতো মহাখুশি, জীবনে এই প্রথম তারা সমুদ্র দেখছে। বঙ্গোপসাগরের বড় বড় ঢেউ একেবারে চরের বুকে আছড়ে পড়ছে। কিছুদূর সামনের দিকে এগিয়ে তিনজন সমুদ্রের পানিতে জিহŸা দিয়ে স্বাদ নিল, পানি এতই লবনাক্ত যে লেজকাটা শেয়ালটা বমি করে দিল।

মুক্ত নীল আকাশে নীচে সমুদ্রের তীরে দুবলার চর ঘুরে ঘুরে দেখছে, শুটকীর গন্ধে লেজকাটা শিয়ালের জিহ্বায় পানি এসে গেল। হাটতে হাটতে কিছুদূরেই দেখতে পেল, শুটকীমহালে হাজার হাজার সমুদ্রিক চুরি, লইট্টা, হাঙ্গর, রূপচাঁদা মাছ কেটে জেলেরা বাঁশের মাচায় রৌদ্রে ঝুলিয়ে রেখেছে। কাঁচা মাছগুলো রৌদ্রে শুকিয়ে শুকিয়ে শুটকি হচ্ছে। তিন শিয়াল চুপি চুপি শুটকির মাচার কাছে গিয়ে রূপচাঁদার শুটকি খেতে লাগল। আহা কি মজা জীবনে এই প্রথম তারা রূপচাঁদার শুটকি খাচ্ছে, আর কোন দিন খায়নি। তিনজনে পেট ভরে শুটকি খেয়ে আবার ধীরে ধীরে হাটতে লাগল এবং কুমিরের জন্য কিছু শুটকি নিয়ে নিল। সামনেই চরের কিনারে পানিতে কুমির অপো করছিল। শুটকি পেয়ে কুমিরতো মহাখুশি গোগ্রাসো সব খেয়ে নিল। কানকাটা, লেজকাটা ও নাককাটা শেয়াল দোবলার চরে তিনদিন আবস্থান করলো। তিনদিনই তারা ইচ্ছেমতো সমুদ্র উপভোগ করলো, সাথে সূর্যাস্থ ও সূর্যোদয় দেখলো। চুরি, লইট্টা, হাঙ্গর, রূপচাঁদার শুটকি মনের সাধ মিটিয়ে খেয়ে নিল। এদিকে দুই গাধা বাঘ রাজার আস্তানাতেই রয়ে গেল তাদেরকে প্রতিদিন গোলপতার ফ্রাই, কেওড়া পাতার চপসহ সুন্দরবনের মধু খেতে দেয়া হলো। চার দিনের মাথায় তিনশিয়াল আবার কুমিরের পিঠে চড়ে বসল, কুমির আবার পশুর নদী বেয়ে আকাঁ-বাঁকা খাল ধরে বাঘ রাজার আস্তানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। সারাদিন শেষে বিকেলে তারা বাঘের আস্তানায় পৌঁছাল। বাঘ রাজার আস্তানায় এসে তারা তিনরাত তিনদিন ঘুমিয়ে কাটাল। দুবলারচরের শুটকি খেয়ে আর সমুদ্রের নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকন করে তারা এমনই নেশার ঘোরে পড়ে গেল যে তাদের চোখে ঘুম আর ঘুম। ঘুম থেকে উঠে তিন শেয়াল টের পেল তারা জীবনে এই প্রথম শান্তিতে লম্বা একটা ঘুম দিয়েছে। খিদায় তাদের পেট চ্যু-চ্যু করছে, যথারিতী রাখার হাজির কাছিমের ডিম, ইদুরের রোষ্ট, টিকটিকির লেজের ফ্রাই, হাঙ্গরের স্যুপসহ আরো অনেক সুস্বাদু খাবার। তিনজনে পেটপুরে খেয়ে নিল। খেতে খেতে তিনজনের মাথাই বাঘ রাজার সমস্যা সমাধানের বুদ্ধি এসে গেল, শলা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত হলো কানকাটা শেয়াল বাঘ রাজার কাছে তাদের বুদ্ধিটা জানাবে।

সন্ধার সময় বাঘ রাজার দরবারে তিন শেয়ালের ডাক পড়ল। তিনজনই প্রস্তুত হয়ে বাঘের দরবারে প্রবেশ করলো। বাঘ রাজাকে কুর্নিশ করে গোলপাতার সুফায় তিনজন বসলো। বাঘ রাজা গত সাতদিন কোন সমস্যা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করে তাদের কুসলাদি জানালো। এবার বানর উজির তিন শেয়ালের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, সম্মানিত মেহমানগণ গত সাতদিন রাজা মহাশয় ও আমরা সকলে মহা টেনশনে ছিলাম, আশা করছি আপনারা এ সাতদিনে আমাদের জন্যে শুভবুদ্ধি নিয়ে এসেছেন। বানর উজিরের কথা শুনে কানকাটা শেয়াল বলতে লাগল, উজির মহাশয় প্রথমে আমাদের তিনজন শেয়াল দুজন গাধার প থেকে সাতদিন আমাদের যেভাবে আপ্যায়ন ও আতিথেয়তা দেখিয়ে সম্মানিত করেছেন তার জন্যে বাঘ মহারাজা ও আপনাদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

সুন্দরবনের রাজত্ব পরিচালনায় বাঘ মহারাজা ও আপনারা বর্তমানে যে মহাসমস্যায় পড়েছেন এ জঙ্গলের তৃর্ণভোজী প্রাণীদের বিদ্রোহের ঘোষনার জন্যে তার সমাধানের ল্েয আমরা তিন শেয়াল ও দুই গাধা মিলে গত সাতদিন বহু শলাপরামর্শ ও বুদ্ধি করে একটি সিন্ধান্তে উপর্নীত হয়েছি যে, এ সুন্দরবনে বাঘ মহারাজারসহ যত মাংশাসী প্রাণী আছে তারা আগামী ছয় মাস ধরে প্রতিনিদ বিভিন্ন প্রাণীর ডিম ভণ করবে। আর এ সুন্দরবনে পাখি, কুমীর, কচ্ছপ, সাপ, মাছসহ অন্যান্য যে প্রাণীরা ডিম দেয় সেসকল প্রাণীর ডিম বানরেরা সংগ্রহ করে অন্যান্য প্রাণীদের সরবরাহ করবে, আর এল্েয বানর উজিরের নেতৃত্বে সারা সুন্দরবনে একটি উচ্চমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে দিতে হবে।

তবে ছয়মাস ডিম খেতে গিয়ে ল্য রাখতে হবে যেন, এসকল প্রাণীর বংশবিস্তারে কোন তি না হয়, সেজন্যে একটি প্রাণী যে কয়টি ডিম পাড়বে তার অর্ধেক বানরেরা সংগ্রহ করবে বাকী অর্ধেক ডিম ফুটে বাচ্চা হয়ে বংশ রা করবে। শেয়ালের এ পরামর্শ বাঘ রাজার খুবই মনপুত হলো। যথারীতি সবার সুন্দরবনে রাজার এ আদেশ বানরেরা ঢুল পিটিয়ে জারী করে দিল। এখন থেকে সুন্দরবনে প্রত্যেক মাংশাসী প্রাণী তাদের চাহিদা অনুসারে ডিম খেতে লাগল।

এদিকে তিন শিয়াল বাঘ রাজার কাছ থেকে ছয়মাস পর আবার এসে পরবর্তীতে কি খেতে হবে তার পরামর্শ প্রদানের প্রতিশ্র“তি দিয়ে দুই গাধার পিঠে চড়ে সুন্দরবন ত্যাগ করলো।

ছয়মাস পর তিন শিয়াল আবার বাঘ রাজার দরবারে হাজির হলো। এবার লেজকাটা শিয়াল বাঘ রাজার উদ্দেশ্যে বললো এখন থেকে সারা সুন্দরবনের সকল মাংসী প্রাণীরা গোলপাতা, সুন্দরী পাতা ও কেওড়া পাতা চিবিয়ে খেতে হবে। বাঘ রাজার এ পরামর্শ পছন্দ হলো, বানর উজিরকে নির্দেশ দিল সারা সুন্দরবনে ঢোল পিটিয়ে দিতে, এখন থেকে সকল মাংশাসী প্রাণীরা গোলপাতা, সুন্দরী পাতা ও কেওড়া পাতা খাবে। বাঘ রাজার নির্দেশ মোতাবেক সকলে পাতা খাওয়া শুরু করে দিল।

এখন আর সুন্দরবনে কোন নিরীহ তৃণভোজী প্রাণী হত্যার শিকার হয় না। সকল প্রাণী মিলেমিশে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল আর বাঘ রাজা মহাসুখে তার রাজত্ব চালিয়ে যেতে লাগলো।

 

Comments
জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য3 weeks ago

বিতর্কিত জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলের কিছু দুর্লভ ছবি

ঢালিউড2 weeks ago

বাংলা সিনেমার সর্বকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে ঢাকা অ্যাটাক

জান্নাতুল নাঈম
অন্যান্য3 weeks ago

জান্নাতুল নাঈমকে মেয়ে বলে এখন স্বীকার করেন না তার বাবা

যে চার ধরনের মিলন ইসলামে নিষিদ্ধ
রূপালী আলো3 weeks ago

যে চার ধরনের মিলন ইসলামে নিষিদ্ধ

শাকিব খান (নাম্বার ওয়ান কিং খান)
বাংলাদেশ2 days ago

শাকিব খান

অপু বিশ্বাস ও আব্রাম খান জয়। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড3 weeks ago

কার্ডে জয়ের বাবা হিসেবে শাকিবের নাম ও নাম্বার দেওয়া হয়েছে : অপু বিশ্বাস

জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল ও শবনম ফারিয়া। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য3 weeks ago

জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলকে নিয়ে যে কথা বলে আলোচনায় শবনম ফারিয়া

সুহানা খান
বলিউড3 weeks ago

শাহরুখ কন্যা সুহানার বিকিনি ছবি ভাইরাল

ছবিটিতে লুকিয়ে আছেন একজন নগ্ন মডেল
রকমারি3 weeks ago

ছবিটিতে লুকিয়ে আছেন একজন নগ্ন মডেল

অপু বিশ্বাস ও আব্রাম খান জয়। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড3 weeks ago

ছবিঘরে দেখুন অপুপুত্র আব্রামের প্রথম জন্মদিনের পার্টি

Advertisement

বিনোদনের সর্বশেষ খবর

আলিয়া ভাট, ব্রিটিশ-ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। ছবি : ইন্টারনেট আলিয়া ভাট, ব্রিটিশ-ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। ছবি : ইন্টারনেট
ঘটনা রটনা24 hours ago

এক গানে শুটিংয়ে ১৪ বার অজ্ঞান হলেন আলিয়া ভাট

সম্প্রতি মুক্তির পাঁচ বছর পূর্ণ করেছে ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ ছবিটি। এ উপলক্ষে ছবির প্রধান তিন তারকা বরুণ ধাওয়ান, আলিয়া...

আয়েশা মৌসুমী, সঙ্গীত শিল্পী। ছবি : আল আমিন লিয়ন আয়েশা মৌসুমী, সঙ্গীত শিল্পী। ছবি : আল আমিন লিয়ন
মৌচাকে ঢিল1 day ago

পোশাক-পরিচ্ছদ কী হবে, দাঁড়িয়ে গান করব না বসে গান করব- এসব কি লেখার বিষয় হলো : আয়েশা মৌসুমী

সংগীতশিল্পী আয়েশা মৌসুমী। রিয়েলিটি শো পাওয়ার ভয়েস থেকে সংগীতাঙ্গনে আগমন তার। ব্যস্ত আছেন টিভি লাইভ, স্টেজ শো ও নতুন গান...

অজ্ঞাতনামা ছবির পোস্টার অজ্ঞাতনামা ছবির পোস্টার
ঢালিউড1 day ago

‘অজ্ঞাতনামা’ ও তৌকির আহমেদের জয়জয়কার

অজ্ঞাতনামা ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশী বাংলা ভাষার নাট্য চলচ্চিত্র। ছায়াছবিটি পরিচালনা করেছেন তৌকির আহমেদ। এটি তার পরিচালিত চতুর্থ চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি...

খলনায়ক মিশা সওদাগর (শাহীন হাসান মিশা)। ছবি : সংগৃহীত খলনায়ক মিশা সওদাগর (শাহীন হাসান মিশা)। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড1 day ago

ধর্মে কর্মে এগিয়ে মিশা সওদাগর

মিশা সওদাগর (শাহীন হাসান মিশা) জনপ্রিয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র খল অভিনেতা। বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে খলনায়ক হিসেবে তিনি নিজেকে তুলেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।...

শাকিব খান। ছবি : সংগৃহীত শাকিব খান। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড1 day ago

‘শাকিব খান আমার ছোট ভাইয়ের মতো, মান-অভিমান হতেই পারে’

সাম্প্রতিক সময়ে বিনোদন জগতে সবচেয়ে আলোচিত নাম শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস। প্রথমে তারা আলোচনায় আসেন ব্যক্তিগত কারণে। এরপর শাকিব...

রফিক শিকদার রফিক শিকদার
ঢালিউড1 day ago

মেধাবী নির্মাতার গল্প

রফিক শিকদার। গুণী নির্মাতা। নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র ‘ভোলা তো যায় না তারে’। জনপ্রিয় নায়ক নীরব আর নবাগতা নায়িকা তানহা তাসনিয়াকে...

আরিফিন শুভ ও মাহিয়া মাহি। ঢাকা অ্যাটাক ছবির দৃশ্য আরিফিন শুভ ও মাহিয়া মাহি। ঢাকা অ্যাটাক ছবির দৃশ্য
ঢালিউড1 day ago

আয়ের দিক দিয়েও মাইলফলক অতিক্রম করেছে ‘ঢাকা অ্যাটাক’

দিন যত যাচ্ছে ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর গ্রহণযোগ্যতা ততই বাড়ছে। যার প্রমাণ, মুক্তির তৃতীয় সপ্তাহেও সগৌরবে চলছে দেশের সিংহভাগ প্রেক্ষাগৃহে। দর্শকের ভিড়...

টেলিভিশন1 day ago

নির্মিত হলো একক নাটক ‘পেইন’

নির্মিত হলো একক নাটক পেইন। ঢাকার উত্তরা, কাওলা, হাতিরঝিল, সাতারকুল, রামপুরা সহ বিভিন্ন সুন্দর লোকেশনে নাটকটির শুটিং হয়েছে। রাসেল এ...

সর্বাধিক পঠিত