Connect with us

প্রবন্ধ

একটি বীক্ষণ | সালেহ মুজাহিদ

Published

on

একটি বীক্ষণ | সালেহ মুজাহিদ
একটি বীক্ষণ | সালেহ মুজাহিদ

আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া সম্পাদিত কবি শুকুর মাহমুদ রচিত গুপিচন্দ্রের সন্যাস

 

গুপিচন্দ্রের সন্যাস নিঃসন্দেহে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক অনুপম নিদর্শন। কাব্য ভাষা বিচার করলে কবি শুকুর মাহমুদের অতি উন্নত কাব্য প্রতিভার নিদর্শন পাওয়া যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আবিষ্কৃত চর্যাপদ থেকে বাংলা ভাষার যে পরিক্রমা তার একটি চমৎকার নিদর্শন আলোচ্য পুঁথিটি। চর্যাপদের দুর্বোধ্য ভাষা পাচ শত বছরের পরিক্রমায় বাংলা ভাষার সাহিত্যের পরিপুষ্টি পুথির মাধ্যমে সাধারণ্যে প্রবেশ করেছিল। নাথ ধর্মের সাধন ভজন প্রক্রিয়া এই সাহিত্যে চমৎকারভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

এই পুঁথির ঘটনা পর্যালোচনায় আমরা দেখি পুরো ঘটনার বিস্তার গুপিচন্দ্র রাজা, তার চার স্ত্রী, মা ময়নামতি রাই ও গুপি চন্দ্র ও ময়নামতির গুরু হাড়িফা বা জলন্ধর (জলন্ধরী পাদ) কে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। সাথে ক্ষেতুয়া নফর আর সুলচনি বেশ্যা শক্তিশালী দুটি চরিত্র চিত্রিত হয়েছে।

আলোচ্য পুথিটি ইতিপূর্বে দুপ্রস্থে সম্পাদিত হয়েছিল। বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্য, ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেন ও বসন্ত রঞ্জন সেন ১৯২৪ সালে প্রথমবার পুথিটির সম্পাদনা করেন। অব্যবহিত পরেই ঢাকা মিউজিয়ামের তদানিন্তন কিউরেটর ডক্টর নলিনিকান্ত ভট্টশালী ১৯২৫ সালে প্রকাশ করেন। এই দুটি পুঁথিই অসম্পূর্ণ ।

বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্যের পুঁথি গুরুশিষ্যের প্রশ্নত্তর পর্বের পরে শেষ হয়েছে আর ভট্টশালির পুঁথি গুরুশিষ্যের প্রশ্নত্তর পর্বের শুরুর দিকেই শেষ হয়েছে। কোনটিতেই মা পুত্রের তত্ব আলোচনা নেই। এদিক থেকে আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া সম্পাদিত পুথিটি সম্পূর্ণ। আলোচ্য পুথিটির একটি বিশেষত্ব হল সম্পাদক মোহাম্মদ জাকারিয়া তিন পুঁথি পর্যালোচনা করে প্রত্যেক পয়ারের সবচেয়ে ভালো পাঠ গ্রহণ করেছেন । লিপিকারদের প্রমাদে অনেক পাঠই ভুল ছিল। ফলে পুরো পুঁথিই চমৎকারভাবে পাঠযোগ্য হয়েছে।

এবার পুথির কাহিনী সংক্ষেপ পর্যালোচনা করা যাক। ময়না মতি রাই মৃকুলের রাজা মানিকচন্দ্রের স্ত্রী। দীর্ঘদিন তাদের ঘরে কোন সন্তানাদি আসেনি। অবশেষে ময়নামতি রাইএর আধ্যাত্তিক গুরু হাড়িফা ওরফে জলন্ধরি পাদ এর বরে তাদের ঘরে গুপিচন্দ্র নামে এক পুত্রের জন্ম হয়। এরকম সন্দেহও করা হয় যে গুপিচন্দ্র আসলে হাড়িফার ঔরসের সন্তান। যাই হোক কুষ্ঠি বিচারে দেখা যায় গুপিচন্দ্রের আয়ু সাকুল্যে উনিশ বছর। অষ্টাদশ বৎসরের পর উনিশ বছরে পড়লে তার আয়ুনাশ হবে। যদি গুপিচন্দ্র গুরু হাড়িফার চরণ সেবা করে তাহলে সত্য, দ্বাপর, ত্রেতা ও কলি চার যুগেই সে অমরত্ত লাভ করবে। যম তাকে ছুতে পারবে না। রাজা মানিকচন্দ্র এগুলো বিশ্বাস করেননি। পুত্রের বয়স যখন দ্বাদশ বৎসর তখন তিনি তিন ব্রাহ্মণ পুরোহিতকে দূত পাঠালেন পুত্রের বিবাহের জন্য কন্যার সন্ধানে। পাতিল ডুবিয়ে পুত্রের জন্য বিবাহ সম্বন্ধ করবার আদেশ দেন রাজা। পূর্বদেশের মহীচন্দ্র রাজ্যেশ্বরের কন্যা চন্দনা সুন্দরী। উত্তর দিকে নিহাল চন্দ্র নরপতি। রাজা হরিচন্দ্রের কন্যা অদুনা সুন্দরী। এই তিন সুন্দরীর সাথে গুপিচন্দ্রের বিবাহ সম্পাদিত হয়। রাজা হরিচন্দ্রের কন্যা অদুনার সাথে বিবাহের ফলশ্রুতিতে রাজা তার ছোট কন্যা পদুনাকে যৌতুক হিসাবে প্রদান করেন। ফলত রাজপুত্র গুপিচন্দ্র স্ত্রী হিসাবে চারজনকে লাভ করেন। তৎপরে মানিকচন্দ্র রাজা গুপিচন্দ্রকে রাজপাটে রাজা হিসাবে স্থাপন করেন। রাণী ময়নামতি রাই এইসব ঘটনা প্রবাহে খুব বিচলিত হয়ে পড়েন পুত্রের স্বল্পায়ুর কথা চিন্তা করে। কিছুদিনের মধ্যে রাজা মানিক চন্দ্র তিন দিনের জ্বরেতে মৃত্যুবরণ করেন। রাজার সাথে চিতায় ময়নামতি রাণী আসন গ্রহণ করে। রাজা ভস্মীভূত হলেও রাণী ময়নামতি ভেজা বস্ত্র ও বসন নিয়ে উঠে আসেন চিতা থেকে। রানী পুত্রকে তার উনিশ বৎসরে মৃত্যুর সংবাদ প্রদান করে এবং আরও জানায় গুরু হাড়িফার সেবক হলেই শুধুমাত্র সে অমরত্ত লাভ করবে। গুরু হাড়িফাকেও সে পুত্রকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করবার বিষয়ে রাজি করায়। গুপিচন্দ্র যেহেতু স্ত্রী সম্ভোগে মত্ত ছিল, তার চিত্ত স্থির ছিল না, ফলে তার কাছে এই জ্ঞান সাধনা অসার বলে মনে হল। হাড়িফাকে তার ভন্ড গুরু বলে ধারণা জন্মাল। ফলে সে হাড়িফাকে হাত পা কোমর বেধে ঘোড়ার পৈঘর বা আস্তাবলে মাটির নীচে হাড়িতে ভরে পুতে দিল। হাড়িফা কিছুই অনুধাবন করতে পারেনি কারণ সে তখন ধ্যানমগ্ন ছিল। পাঁচ বৎসর সে মাটির নীচে হাড়িতে আসন পেতে ধ্যানে ছিল। হাড়িফার শিষ্য কানেফা বা কর্ণপা বা কাহ্নপা গুরু হাড়িফার সন্ধানে পূর্ব পশ্চিম সব দিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল। অন্যদিকে গোরাক্ষনাথ তার গুরু মীননাথ এর সন্ধানে ছিল। কানেফা গোরাক্ষনাথকে জানালেন যে তার গুরু মীননাথ কদলি শহরে নটিনী পরিবেষ্টিত অবস্থায় আছে। তার চরিত্রের স্খলন হয়েছে। গোরাক্ষনাথ কানেফাকে বললেন যে তার গুরু হাড়িফা মৃকুল শহরে ঘোড়ার আস্তাবলের নীচে হড়ির মধ্যে পোতা অবস্থায় আছেন। কানেফা ময়নামতির উপস্থিতিতে তার গুরু হাড়িফাকে উদ্ধার করেন। রাণী খুবই লজ্জিত হন গুরুর এরূপ অসম্মানে। ইত্যবসরে রাণী গুপিচন্দ্রকে বোঝাতে সক্ষম হন যে তার আয়ু খুব বেশী একটা নেই কাজে হাড়িফা সেবক হওয়া ছাড়া তার আর গত্যন্তর নেই। রাজা গুপিচন্দ্র গুরু হাড়িফার সাথে সন্যাস যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তার চার স্ত্রী মুষড়ে পড়েন এবং নানাভাবে পথ রোধ করবার চেষ্টা করেন। স্বামীকে বঝাবার চেষ্টা করে যে তারা যমরাজের স্ত্রীকে ভেট দিয়ে তাকে হাত করে গুপিচন্দ্রকে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে আনবে। গুপিচন্দ্র তা অগ্রাহ্য করলে তারা হাড়িফাকে ভোজের নিমত্রন করে সাপের বিষ মাখা ব্যঞ্জন ভক্ষণ করায়। হাড়িফার তাতে কোন অসুবিধা হয়না। অবশেষে গুপি হাড়িফার সাথে সন্যাস যাত্রা করেন। হাড়িফা গুপিকে সঙ্গে করে তার বহু পাহাড় নদী বোন জঙ্গল পার হয়। গুপি বাড়ি থেকে একুশ বুড়ি কড়ি সঙ্গে করে নিয়ে এসছিল। মনস্থ করেছিল যে গুরু হাড়িফাকে তা দেবে। কিন্তু মন্ত্রবলে হাড়িফা তা উধাও করে দেয়। পরবর্তীতে হাড়িফা গুপিচন্দ্রের কাছে একুশ বুড়ি কড়ি চাইলে গুপি দেখে যে তার থলিতে একুশ বুড়ি কড়ি নেই, উধাও হয়ে গেছে। সে হাড়িফার কাছে খুব লজ্জিত হল। হাড়িফা গুপিকে সুলোচনি বেশ্যার কাছে নফর হিসাবে বিক্রি করে দেয় একুশ বুড়ি কড়ি দিয়ে। সুদর্শন রাজাকে পেয়ে বেশ্যার হয় মন উচাটন। বেশ্যা রাজাকে কামনা করে। রাজা সাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়। গুপিচন্দ্র রাজা বেশ্যাকে বলে সে চার অপরূপা সুন্দরী রাণীকে ফেলে এসেছে। সে সন্যাসি নারী সঙ্গ বিয়োজন করেই সে সন্যাসি হয়েছে। এতে সুলোচনি বেশ্যা খুব ত্যক্ত হয় এবং গুপিকে দিয়ে পানি টানানোর অমানুষিক পরিশ্রম করায়। যখন আঠার বৎসর পার হয়ে উনিশ বৎসর হতে আর একদিন বাকি তখন গুপি গুরুর ধ্যান করতে থাকে, তার আয়ু শেষ পর্যায়ে। গুরু শিষ্যের এই ডাক শুনতে পান এবং বেশ্যার বাসায় হাজির হন। গুপিকে বেশ্যার কাছ থেকে একুশ বুড়ি কড়ি দিয়ে ফের কিনে নেন। এরপর গুপি গুরু হাড়িফার কাছে তান্ত্রিক জ্ঞান শিক্ষা করেন এবং গুরুর বরে অমরত্ত লাভ করে। শিষ্য গুরুকে অসংখ্য প্রশ্ন করে। গুরু তার উত্তর দেন এই প্রশ্নত্তরেই জ্ঞানের আদান প্রদান হয়। জ্ঞানআলোক প্রাপ্ত হবার পর গুপিচন্দ্র মৃকুল শহরে উপস্থিত হন। অতঃপর মা ময়নামতির সাথেও তার গুড় তত্বজ্ঞান বিষয়ে আলাপচারিতা হয়।

মোহাম্মদ যাকারিয়া সম্পাদিত আলোচ্য পুথিটি নাথ সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন। নাথ ধর্ম বাংলার মাটিজাত ধর্ম। সেন আমলে এদেশে বৌদ্ধভিক্ষুরা এদেশে নিপীড়িত হতে থাকে তারা নেপাল ভুটান হয়ে তিব্বতে আশ্রিত হয়। আর যারা এদেশে রয়ে যান তাদের একটি দল ধর্ম নাথ ধর্মের তান্ত্রিক সাধনার মধ্যে নিজেদেরকে মিশিয়ে ফেলেন। এখানে হিন্দু পুরাণের বহু কিছু গৃহীত হয়। আহমদ শরীফ তার বাউলতত্ত্ব বইতে উল্লেখ করেছেন “কোন কোন বৌদ্ধ সম্প্রদায় কিছু হিন্দু দেবতা ও আচার গ্রহণ করে হিন্দুয়ানীর আবরণে পৈত্রিক ধর্ম বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসী হয়। এরূপে এক যোগী-তান্ত্রিক-বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রজ্ঞা-উপায়ের পরিবরতে ‘শিব-উমা’ নাম দিয়ে নিজেদের প্রাচীন বিশ্বাস সংস্কার চালু রাখে”। নাথ ধর্মের চুরাশি সিদ্ধা আর বুদ্ধ ধর্মের গুরুরা সবাই একই। বুদ্ধদের কাছে যিনি মীনপাদ বা মীনপা নাথদের কাছে মীননাথ বা মতছেন্দ্রনাথ। কাহ্নুপাদ বা কাহ্নুপা নাথদের কাছে কানেফা বা কৃষ্ণনাথ। কৃষ্ণনাথ পুরপুরি বাঙ্গালি ছিলেন এবং নওগার সোমপুর বিহারের একজন আচার্য ছিলেন। প্রধান চারজন নাথ সিদ্ধাকে হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র দান করা হয়। গুপিচন্দ্রের সন্যাসে আছে চারজন সিদ্ধার জন্ম শিবের চার অঙ্গ হতে –

অচেতন পাইলা শিব তাতে হইল চারি জীব
গোরখ নাথ হইল শিবের মুণ্ডে।
কানে কানেফা হইল হাড়ে হাড়িফা জন্মিল
মীননাথ জন্মিল নাভিকুন্ডে।।

আলোচ্য পুথিতে কাহিনিকারের নাম গৌরিপার্বতী লেখা হয়েছে পুঁথির সর্বত্রই। লিপিকার কেন এটা করেছেন সেটা বোধগম্য নয়। হিন্দু নাম দেবার কারণ হতে পারে আম জনতার মধ্যে হিন্দু কবি হলে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। মোহাম্মদ যাকারিয়া অন্য দুটি পুঁথির সাথে মিলিয়ে এই সিদ্ধান্তে উপোনিত হন যে আলোচ্য পুঁথি শুকুর মাহমুদ বিরচিত পুঁথি – গুপিচন্দ্রের সন্যাস। অন্য এক পুঁথির প্রসঙ্গে মোহাম্মদ যাকারিয়া ডক্টর শহীদুল্লাহর অভিমত সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন –

“প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে যে কবি ভবানীদাস বিরচিত ‘ময়নামতির গান’ নামে যে কাহিনী ভট্টশালী এবং বিশ্বেশ্বর বাবুরা প্রকাশ করেন তার প্রকৃত রচয়িতা সম্পর্কে ডক্টর শহীদুল্লাহ তার ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ গ্রন্থে একটি অতি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন। তার মতে ভবানিদাসের রচনা বলে পরিচিত এ কাহিনীর রচয়িতা আদতে একজন নাম না জানা মুসলমান কবি। ডক্টর শহীদুল্লাহর এই অভিমতের পেছনে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য যুক্তি আছে”।

শুকুর মাহমুদের কাব্য প্রতিভা অসাধারণ তা তার উপমা চয়ন, উৎক্ষ্রেপ, কাহিনী বর্ণনার মধ্যে স্পষ্ট। হরিচন্দ্র রাজার কন্যা অদুনা সুন্দরীর রুপ বর্ণনা করেছেন কবি শুকুর মাহমুদ –
শচী রতি রম্ভা জিনি রুপে অনুপম।।

অরুণ জিনিয়া মুখ চন্দ্র শশধর।
ধ্যানভঙ্গ হয় কত দেখিয়া মুনিবর।।
দশন মুকতা জিনি সদায় তাম্বুল খাএ।
কুকুলি জিনিঞা স্বর মধুর কথা কএ।।
নাসিকার গঠন জিনি কানায়ার হাতের বাঁশি।
ভুবন ভুলাতে পারে চন্দ্র মুখের হাসি।।

সুলোচনি বেশ্যার সাজ সজ্জার বর্ণনা করেছেন কবি শুকুর মাহমুদ অসাধারণভাবে –

হস্তে করি নীল বেশ্যা সুবর্ণের চিরুণী ।
মস্তকের কেশ চিরি গাঁথিল বিয়ানি।।
গন্ধ পুষ্প তৈল বেশ্যা পরিল মাথাতে।
সুবর্ণের জাদ বেশ্যা পরিল খোপাতে।।
কাম সিন্দুরের ফোটা পরিল কপালে।

বেশ্যার রুপ আর ছলাকলা কবি শুকুর মাহমুদ বর্ণনা করেছেন অসাধারণভাবে –
আঁখির মটকে জ্ঞান হরে যুবক জনে ।।
অধর শোভিত করল করপূর তাম্বুলে।
দশন ভ্রমর যেন বসিল কমলে।।
পান খাইয়া বেশ্যা মদন মুরলী ।
বুকের উপরে যেন চম্পকের কলি।।
চিকন মাঞ্জা দিঙ্গল কেশ বাএ হালে গাও।

শুকুর মাহমুদ কবি হিসাবে যেমন উঁচু মাপের তেমনি তার তত্ত্ব জ্ঞানও অসাধারণ। নাথ ধর্মের জটিল সাধন পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন, তেমনি গীতা, মহাভারত, বেদ, উপনিষদ সম্পর্কেও তার অগাধ পান্ডিত্ব ছিল। তার পিতা একজন ফকির অর্থাৎ সুফিসাধক ছিলেন, তিনি নিজেও একজন সুফি ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। এই কাব্যে প্রত্যেকটি ধারাকেই কবি স্পর্শ করেছেন।

কাহিনী বর্ণনের সাথে সাথে আলোচ্য পুঁথির মূল উপজীব্য হল সাধন তত্ত্ব। এই কাব্যে চর্যাপদের অনেক কাব্যের সরাসরি এবং আংশিক মিল রয়েছে। আমরা তত্ত্ব আলোচনার গভীরে না যেয়েও আমরা ৩৩ নং চর্যাপদে পাই –

টালত মোর ঘর নাই পরবেষী ।
হাড়ীত তাত নাই নিতি আবেশী।
বেঙ্গস সাপ চরিল জাই।
দুহিল দুধকি বান্টে সামাই।।
বলদ বিআএল গাবিআ বাঝে।
পীঢ়া দুহিআই এ তীনি সাঝে।।
জো সো বুধি সোহি নিবোধি।
জো সো চোর সোহি সাধী।।
নিতি নিতি সিআলা সিহে সম জুঝই।
ঢেণ্টণ পাএর গীত বিরলে বুঝাই।

ষোড়শ শতকের মরমি কবি কবিরের ভনিতায়ও অনুরূপ কিছু পদ আছে। হতে পারে কোন বৌদ্ধ সিদ্ধার থেকে কবির তা গ্রহণ করেছিলেন। আর আলোচ্য পুথি গুপিচন্দ্রের সন্যাস এ আমরা পাই –

ভরিল এন্দুরে নাও বিড়াল কাণ্ডারী।
শুতিয়া আছেন ব্যাঙ্গ ভুজঙ্গ প্রহরী।।
বলদ প্রসব হইল গাই বাঞ্ঝা।
বাছুরকে দোহাএ তাহার দিন তিন সানজা।।
ছঞ্চার পানি ফুটি টুঞি করিআ ধাএ।
শুয়া পক্ষী বসিয়া বিড়াল ধরিয়া খাএ।।
শৃগাল হইয়া সিংহের সাথে যুঝে।
কুটিকের মধ্যে গুটিকে তাহা বুঝে।।

পরিশেষে বলা যায় আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া আলোচ্য পুঁথির প্রায় প্রতিটি পয়ারের প্রতিটি শব্দের যে টিকা টিপ্পনি দিয়েছেন তাতে পুঁথির পাঠোদ্ধার আমার মত সাধারণের জন্য অনায়েস হয়েছে। আলোচ্য বইটিতে সন্নিবেশিত সম্পাদকের জবানবন্দিতে জনাব যাকারিয়া জানিয়েছেন যে তিন বৎসরের অধিককালের নিরলস পরিশ্রমের ফসল তার এই বইখানি। যখন এটি সম্পাদনা শেষ পর্যায়ে তখন দেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধ। জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে চরম সংকটে ছিলেন তিনি অন্য সকলের মতই। যাই হোক কৃতজ্ঞ চিত্তে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়াকে স্মরণ করি বাংলা সাহিত্যের এমন একটি অমুল্য রত্ন গুপিচন্দ্রের সন্যাস পুথিটিকে পুনঃআবিস্কার করার জন্য।

Leave a comment

Advertisement Rupalialo Ads
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement
শাকিব খানের ‘প্রিয়তমা’ হিসেবে বুবলী নয়, অপু বিশ্বাসকে দেখতে চান ভক্তরা
ঘটনা রটনা2 weeks ago

শাকিব খানের ‘প্রিয়তমা’ হিসেবে বুবলী নয়, অপু বিশ্বাসকে দেখতে চান ভক্তরা

‘মাস্ক’ পরিহিত কিং শাকিব খান। ( বি.দ্র. : ছবিটি গ্রাফিক্সের সাহায্যে তৈরি)
ঢালিউড2 weeks ago

এই প্রথম ‘মাস্ক’ পড়ে সিক্রেট মিশনে কিং শাকিব খান

শাকিব খান এবং শবনম বুবলী (Shakib Khan and Shobnom Bubly)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা1 week ago

অপু নয়, শাকিব খানের প্রিয়তমা বুবলী

শাকিব খান এবং জিৎ। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা2 weeks ago

শাকিব খান এবং কলকাতার জিৎ এবার একই ছবিতে

শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা1 week ago

শাকিব-অপুর বিচ্ছেদ রটনা নিয়ে ভক্তরা আতঙ্কিত

শাকিব খান। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা4 weeks ago

‘চালবাজ’ ভেঙে দিবে শাকিব খানের সব অতীত রেকর্ড

শাকিন খান ও শবনম বুবলী (Shakib Khan and Shobnom Bubly)
ঘটনা রটনা2 weeks ago

শাকিব খানের ‘প্রিয়তমা’ বুবলী?

‘চালবাজ’ ছবির শুটিংয়ে ঢালিউড কিং শাকিব খ‍ানের সঙ্গে খল অভিনেতা আশীষ বিদ্যার্থী। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা4 weeks ago

‘চালবাজে’র শুটিংয়ে শাকিব খ‍ানের চালব‍াজি

মৌনী রায়। ছবি : ইন্টারনেট
ঘটনা রটনা4 weeks ago

‘নাগিন’খ্যাত বাঙালীকন্যা মৌনীকে আর হয়তো টেলিভিশনে দেখা যাবে না

অভিনেত্রী সজল এবং অভিনেত্রী সাদিয়া জহান প্রভা। ছবি : ফেসবুক
টেলিভিশন2 weeks ago

সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনেই সজল-প্রভার বিয়ে

Advertisement

বিনোদনের সর্বশেষ খবর

tamanna-bhatia-bahubali. tamanna-bhatia-bahubali.
বলিউড6 days ago

তৈরি হচ্ছেন তামান্না

চরিত্রের চাহিদা মেটাতে নিজেকে নানান ভাবে ভাঙ্গেন গড়েন তারকারা। তবে নিজেকে প্রস্তুত করতে এবার সুদুর ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছেন দক্ষিণের সুন্দরী...

শ্রাবণী পুষ্প। ছবি : সংগৃহীত শ্রাবণী পুষ্প। ছবি : সংগৃহীত
সঙ্গীত6 days ago

পুষ্পর সোনা জাদুরে

সময়ের অন্যতম মডেল-অভিনেত্রী শ্রাবণী পুষ্প। সম্প্রতি কাজ করেছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সন্দীপনের গাওয়া ‘সোনা জাদুরে’ শিরোনামের একটি গানের মিউজিক ভিডিওতে। এই...

শাকিব খান (Shakib Khan)। ছবি : সংগৃহীত শাকিব খান (Shakib Khan)। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড6 days ago

থাইল্যান্ডে শাকিব খান, রয়েছেন অপেক্ষায়

চিত্রনায়ক শাকিব খান কলকাতার ‘মাস্ক’ ছবির শুটিংয়ে গেল ৪ নভেম্বর উড়াল দিয়েছিলেন থাইল্যান্ডে। এই ছবির শুটিং এর ফাঁকে বাংলাদেশের উত্তম...

চিত্রনায়িকা অধরা খান। ছবি : সংগৃহীত চিত্রনায়িকা অধরা খান। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড1 week ago

অধরার নতুন নায়ক বাপ্পী চৌধুরী

সম্প্রতি ‘নায়ক’ শিরোনামের একটি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হন বাপ্পী চৌধুরী। কিন্তু নায়িকা নিয়ে মনস্থির করতে পারছিলেন না পরিচালক ইস্পাহানি আরিফ জাহান।...

শাকিব খান ও ববি (Shakib Khan and Boby) । ছবি : সংগৃহীত শাকিব খান ও ববি (Shakib Khan and Boby) । ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা1 week ago

দর্শকদের মাতাল করতে জুটি বাঁধলেন শাকিব খান ও ববি

হিরো দ্যা সুপারস্টার ছবির সাফল্যের তিন বছর পর আবার চিত্রনায়ক শাকিব খান প্রযোজনায় ফিরছেন। এই নায়কের নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা এসকে...

শাকিব খান এবং শবনম বুবলী (Shakib Khan and Shobnom Bubly)। ছবি : সংগৃহীত শাকিব খান এবং শবনম বুবলী (Shakib Khan and Shobnom Bubly)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা1 week ago

অপু নয়, শাকিব খানের প্রিয়তমা বুবলী

দেশের চলচ্চিত্রে বর্তমান সময়ে সর্বাধিকসংখ্যক ব্যবসা সফল সিনেমা উপহার দিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন শাকিব খান। স্বাভাবিকভাবেই তাকে নিয়ে দর্শকের আগ্রহ...

শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস। ছবি : সংগৃহীত শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা1 week ago

শাকিব-অপুর বিচ্ছেদ রটনা নিয়ে ভক্তরা আতঙ্কিত

অবশেষে বিয়েবিচ্ছেদ ঘটতে যাচ্ছে ঢাকাই ছবির আলোচিত তারকা দম্পতি শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসের। শিগগিরই তাদের মধ্যে ডিভোর্স ঘটবে বলে...

নায়লা নাঈম (Naila Nayem)। ছবি : সংগৃহীত নায়লা নাঈম (Naila Nayem)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা1 week ago

চিত্রনায়িকার খাতায় নাম লেখালেন আলোচিত নায়লা নাঈম

দেশীয় মিডিয়ায় আলোচিত-সমালোচিত মডেল নায়লা নাঈম। পেশায় একজন দন্তচিকিৎসক হলেও মডেল হিসেবেই তার পদচারণা বেশি। বিশেষ করে ছবির আইটেম গানে...

Advertisement

সর্বাধিক পঠিত