fbpx
Connect with us

রূপালী আলো

ক্ষত | ম্যারিনা নাসরীন

Published

on

ক্ষত | ম্যারিনা নাসরীন
ক্ষত | ম্যারিনা নাসরীন

ঘরের দাওয়ায় বসে এক মনে জাল বুনছে মাধব । জালের এক প্রান্ত খুঁটিতে বাঁধা । অন্য প্রান্তে দ্রুত হাতে কাঠি ঘুরছে আর একটা একটা করে নতুন ঘর তৈরি হচ্ছে । কিন্তু চেহারায় সৃষ্টির কোন আনন্দ নেই বরং কিছুটা উদাস বা বিমর্ষ। জাল বুনে আর কি হবে ? বাজারে এ জিনিসের আর কদর নেই । আগে জাল তৈরির জন্য অনেক বায়না আসত। বুনে সে শেষ করতে পারত না । আর এখন কালে ভদ্রে দুই একটা পাওয়া যায় । জেলেরা আর আজকাল জাল খোঁজে না । পরপর কবছর খরা চলছে। ব্রহ্মপুত্রের বুকে বিশাল বিশাল চর । নদীতে কোথাও হাঁটু সমান জল, কোথাও বা বুক সমান । জাল ফেলে টেনে আনলে শামুক-ঝিনুক, শ্যাওলা ছাড়া কিছুই উঠে আসে না । মাছের কোন বালাই নেই । সারাদিন জাল নিয়ে ঘুরে বেড়ালে তো পেট ভরবে না। জেলেরা মাছ ধরা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে বলা যায়। নেহায়েত অন্য কাজে পটু নয় বলেই মাধব জাল বোনাটা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সে মাছ ধরতে জাল নিয়ে জলে নামে না। সে বড় পরিশ্রমের কাজ।

অদূরে উঠোনে মালতী একটা কাঠের মুড়িতে ধানের আঁটি বাড়ি দিয়ে বিচালি থেকে ধান ঝাড়ছে । মালতীর ফর্সা শরীরে নীল শাড়িটা যেন গিলে ধরেছে । হাত উঁচু করলে বগলের কাছে লাল ব্লাউজের অনেকটা অংশ ঘামে ভিজে গিয়েছে দেখা যায় । গলায়, কপালে আর নাকের পাশটাতে মুক্তোর মত ঘাম । আটাইশ বছরের নিঃসন্তান মালতীর শরীর আটসাট, মজবুত । কোমরের শাড়ির প্যাঁচে শরীরের খাঁজ ভাঁজগুলো আরো সু-স্পষ্ট এবং মোহনীয় । গলার ঘাম গুলো জড় হয়ে একটা জলধারা তৈরি করেছে। সেটি বুকের মাঝ বরাবর শীর্ণ ঝর্না ধারার মত প্রবাহিত হচ্ছে । ধানের আটি হাতে মালতী যখন নিচু হচ্ছে সেই ঝর্ণা এলাকার অনেকটাই ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি গোচর হয় । মাধব এক দৃষ্টিতে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পুনরায় জাল বোনার কাজে মন দেয়।

মালতীর পাড়াতো দেবর ছাব্বিশ বছরের যুবক অমল । উঠোনের এক কোনের পেয়ারা গাছটিতে হেলান দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে সে দাঁত খিলাল করছে । তার দৃষ্টিও মালতীর দিকে। একসময় অমল চেঁচিয়ে বলে,
“বৌদি আরও জোরে! বিচালিতে তো ধান থাইকাই যাইতাছে ।”

“এর চাইতে জোরে পারতাম না । তা তুমি যে ভঙ্গি ধইরা খাড়ায়া আছ, একবার আইয়া পড় । দেহি শইল্যে কত জোর ।“

আহ্লাদী ভঙ্গিতে জবাব দেয় মালতী ।

“আরে বৌদি, আগে কইবা না ? দেও দেহি । এইগুলান কি মাইয়া মাইনষের কাম ? মরদ হওন লাগে । ক্যান যে তোমারে দিয়া মাধবদা এইত্তা কাম করায় ?”
অমল হাত থেকে ধানের আঁটি নিয়ে আলতো করে নিজের শরীরটা লাগিয়ে একটু ধাক্কা দেয় মালতীর নিতম্বে। চুপি চুপি বলে, ‘বৌদি শইল একখান বানাইছ মাইরি।কাঁঠাল কাঠের পুষ্ট ঢেঁকির লাহান।’ মালতী চোখে টিপ দিয়ে অমলকে পালটা ধাক্কা দেয়,

‘নজর দিবা তো চোখ দুইখান তুইলাম নিয়াম আমার সাধের দেওরা।’

মাধব বারান্দায় বসে সব কিছু খেয়াল করে । তার বুকে ঈর্ষার দাবাগ্নি জ্বলে ওঠে । সে জাল গুটিয়ে রেখে নেমে আসে উঠোনে । অমলের হাত থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নেয় ধানের আঁটিটা ।

“যা গা ! তোর কামে তুই যা । আমি ধান বাড়াইতে পারবাম । বিহান মেলায় এই হানে তোর কিয়ের কাম ?”

রাগে মাধবের মুখ থেকে যেন আগুনের রক্তিম আভা ঠিকরে বের হচ্ছে ।

অমল কোন কথা না বলে চুপচাপ চলে যায় ঘাটের দিকে । মালতী ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, হঠাৎ মাধবের কি হল ! অমলের এই কাজ তো নতুন কিছু নয় । সে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থাকে ।

মাধব তার দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে ওঠে,

“খাড়ায়া রইছস ক্যা ? কোন কাম কাজ নাই ? পাক ঘরে যা গা । কাম কর গিয়া । হুদাই খাড়ায়া থাইকা কি লাভ ?”

মালতী দৌড়ে গিয়ে রান্না ঘরে ঢুকে । কিন্তু কোন কাজ করে না । পিঁড়িটা টেনে বসে । পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মেঝের মাটি খুঁড়তে থাকে । সে জানে মাধবের বুকের জ্বালাটা কোথায় । সেই আগুনে সেও অহর্নিশি জ্বলে । এই জ্বলুনির কোন শেষ নেই ।

মাধবের সঙ্গে যখন মালতীর বিয়ে হয়, তখন তার বয়স চৌদ্দ কি পনের বছর হবে । গরিব বাবা লেখাপড়া তেমন শেখাতে পারেনি । স্কুলে কিছুদিন গিয়েছিল । বানান করে টুকটাক পড়তে পারে । একে তো সুন্দরী তার উপর বাড়ন্ত শরীর । চারদিকের কুনজর পড়তে থাকে মেয়ের উপর । গরিব বাপের এইটুকুনু সুন্দরী মেয়ে নিয়ে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায় । হিন্দু ঘর , জাত কুল মিলিয়ে পাত্র পাওয়া অনেক কঠিন । তারপর আছে এক কাড়ি যৌতুকের জ্বালা ! বাবা দিশেহারা হয়ে পড়ে । এর মধ্যে মাধবের সাথে বিয়ের প্রস্তাব আসে । নগদ দশ হাজার টাকা আর এক ভরী স্বর্ণ ছাড়া তাদের আর কোন দাবী নেই । এটুকু জোগাড় করাও মালতীর বাবার জন্য সহজ ছিলনা তবুও বিয়েতে রাজী হয়ে গিয়েছিল । মেয়ে তো নয়, ঘাড়ের বোঝা !কোন রকমে নামাতে পারলেই বাঁচে । বাবা ধারদেনা করে মেয়েকে ছাদনাতলায় বসিয়ে দেয়।

শোলার টুপি পরা লম্বা চওড়া বাইশ চব্বিশ বছরের মাধবকে দেখে সবাই মুগ্ধ । পিসতুতো মাসতুতো বোনেরা কত ঠাট্টা ! ঠাকুমার কথা শুনে তো মালতী র কান লাল হয়ে গিয়েছিল । শুভ দৃষ্টির সময় গামছার নিচে যখন সে স্বামীর দিকে লাজুক চোখে তাকিয়েছিল তখন মনে হয়েছিল ভগবান তার মনের আশা পূরণ করেছেন ।

কালরাত পার হল । তারপর আসলো প্রত্যেক মেয়ের জীবনের বহু আকাঙ্ক্ষার সেই ফুলশয্যার রাত । কিন্তু বৌদি কানে কানে যে কথা বলেছিল, ঠাকুমা যে অশ্লীল ইঙ্গিত দিয়েছিল, তার কিছুই সে রাতে ঘটল না ।

মালতী অবাক হলেও বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি । কিন্তু কিছুদিন যেতেই মালতীর বুঝতে কিছু আর বাকি রইল না ।

হিন্দুর ঘরের মেয়ে । স্বামী কি সেটা বুঝার আগে থেকেই সে জেনে এসেছে স্বামীই ধর্ম । স্বামীই কর্ম । বারটি বছর ধরে সে নিঃসন্তান । বুকের মধ্যে নিদারুণ কষ্ট চেপে মুখে হাসি এনে সে সংসার করে যাচ্ছে । কিন্তু মাঝে মাঝে তার শরীর বিদ্রোহ করে, তার মন বিদ্রোহ করে । কোন কোন রাতে মাধবকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে পিষে ফেলতে চায় । কিন্তু মাধবের শরীর? হা ভগবান, যেন একখন্ড শীতল বরফ!

শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে মাধব ধানের মুঠো ধরে কাঠের টুকরোয় বাড়ি দিতে থাকে । মনের সমস্ত জ্বালা যেন সে ধানের উপর মিটাতে চায় । ধানগুলো বিদ্রোহী হয়ে দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে থাকে ।

ধান ছাড়ানোর কাজ শেষ হলে মালতীর খোঁজে চারদিকে তাকায় মাধব । উত্তেজনার বশে এত সময় খেয়াল করেনি সে , এখন মনে হল মালতী সেই যে পাকঘরে ঢুকেছে । তারপর আর কোন সাড়াশব্দ নেই ।

দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে ঢোকে মাধব । রান্না ঘর বলতে উঠোনের এক কোণে চাঁটাই দিয়ে ঘেরা , ছনের ছাউনির ছোট্ট একটা খুপরি ঘর । মেঝেতে পাশাপাশি দুটো মাটির চুলা। মালতী তখনও পিড়িতে চুপচাপ বসে আছে । পা দিয়ে মেঝে খুড়ে অনেকটা গর্ত করে ফেলেছে । দেখে মাধবের মাথায় যেন আগুন ধরে যায় । সে চিৎকার করে উঠে ,
“ওই বড়লোকের বেটি, কি হইছে তোর ?”

মালতী কিছু বলে না । ঘাড় গুঁজে বসে থাকে ।

“কিরে, কথা কস না ক্যা ? ও, নাগররে বালা মন্দ কইছি, হ্যার লাইগা বুঝি কইলজা জ্বলতাছে ?” মুখে শ্লেষ এনে বলে মাধব ।

ঝট করে মাথা তুলে তাকায় মালতী । চোখ টকটকে লাল ,বুঝা যায় এত সময় সে কান্নাকাটি করছিল।

“কি কইলা তুমি ? নাগর ক্যাডা ? খারাপ কথা কইবা না কইয়া দিলাম ।”

“ও ,লাগছে না ? আমি মনে হয় কিছুই দেহি না, বুঝি না ? আন্ধা পাইছো আমারে ? অমলের সাথে তোর এত খাতির কিয়ের, আমি জানিনে ? শুধু আমি ক্যান পাড়ার হগলেই জানে ।”
“জানো, তাইলে এত কথা কও ক্যা ?”

“কি কইলি খানকী মাগী ? তোরে এতবড় সাহস ?তোরে কিসের অভাবে রাখছি আমি?”
“গাইল দিবা না কইলাম । কিসের অভাবে রাখছ, জানো না ?”

কার্বলিক এসিডের গন্ধ পেলে সাপ যেমন মাথা নিচু করে পালানোর পথ খোঁজে । মালতীর এ কথার পর মাধব ও তেমনি ঘর থেকে বেরিয়ে যেন পালিয়ে বাঁচে।

আরও কিছুক্ষণ মুখ নিচু করে বসে থাকে মালতী । তারপর গামছা কাঁধে ফেলে টিনের কলসিটা কাঁখে নিয়ে ধীরে ধীরে ব্রহ্মপুত্রের ঘাটের দিকে রওনা দেয় ।

বাড়ির কাছেই ঘাট । ঘাট বলতে নদীর পাড় থেকে একটা চিকন রাস্তা ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে । পানির সীমানায় কিছু পাথর বসানো । এখন গ্রীষ্মকাল । নদীতে তেমন স্রোত নেই । নদীর জল শুকিয়ে হাঁটু সমান হয়েছে । ব্রহ্মপুত্রের ধারের এই বাওশিয়া গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই নদীতে গোসল করে । কিন্তু এখন নদীতে ডুব দিয়ে গোসল করা যায় না । ঘাটে বসে ঘটি ডুবিয়ে মাথা ভেজাতে হয় । মালতী যখন বউ হয়ে এ গায়ে এসেছে তখন এ নদীর কি রূপ ! চঞ্চলা ষোড়শীর মত প্রমত্তা ঢেও ছিল নদীতে। আর এখন যেন জরাগ্রস্ত বৃদ্ধা ।

মালতী অভ্যাস বশত দ্রুত পায়ে ঢালু রাস্তা দিয়ে নিচে নেমে যায় । গ্রামের আরও কিছু নারীপুরুষ গোসল করছে । ময়লা আঠালো পানি । দূরে ছেলেমেয়েরা পানিতে খেলছে । আনন্দে লাফালাফি করছে । ও পারে খাঁখাঁ বিরান চর । মালতী কলসটা রেখে পানিতে পা ডুবিয়ে একটা পাথরের উপর বসে । তার চোখে আটকে আছে চরটিতে । দুপুরের রৌদ্র যেন তিরতির করে কাঁপছে । মালতী র চোখে ধাঁধাঁ লাগে ।

তার বিষণ্ণ চেহারা দেখে রাখালের বউ এগিয়ে আসে । মালতীর কাঁধে হাত রেখে বলে, “কি হইছে বৌদি ? তুমারে আইজকা এমুন লাগতাছে কেন ?”

মালতীর চোখ ভিজে ওঠে, কিন্তু সে চট করে মুখ ঘুরিয়ে নেয় ।

“কিছু না বইন ,আজ শইলডা বালা না তো, এর লাইগগাই।” মালতী চোখে মুখে পানির ছিটা দেয় ।

নদীর ঘাট এখন প্রায় খালি । দূরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো এখনো কোলাহলে ব্যস্ত । সেদিকে তাকিয়ে মালতীর বুক ঠেলে কান্না আসে । কিন্তু কাঁদে না। কি লাভ কেঁদে। ভগবানের ইছের ওপর হাত আছে কার?

নদীর একপাশে বাঁধ তৈরি হচ্ছে । বর্ষার প্রকোপে যাতে করে উত্তাল নদীর পাড় না ভাঙে সে জন্যই এ ব্যবস্থা। সেদিকে তাকিয়ে মালতীর মনে হয় সেও যেন নদীটার মতই । তার ভরা শরীরের উদ্দামতা সে একরকম বাঁধ দিয়েই মানিয়ে রেখেছে । শরীরকে না হয় পোষ মানানো গেল । কিন্তু তার মাতৃহৃদয় তো কোন বাঁধ মানতে চায়না । সেখানে তো নিরন্তর শুন্যতার জোয়ার বইছে । এই জোয়ার সে কি দিয়ে আটকাবে ?

পায়ের কাছে কয়েকটা শ্যাওলা এসে জড়ো হয়েছে । মালতী সেগুলো পা দিয়ে ঠেলে আবার স্রোতের দিকে ভাসিয়ে দেয় । নীরব মধ্যাহ্ন । সবাই যার যার ঘরে হয়ত খাওয়া দাওয়ায় ব্যস্ত । মালতী র খেয়াল হয় আজ এখনো তার রান্না হয়নি । মাধব হয়ত অপেক্ষা করছে । দ্রুত দু ঘটি জল শরীরে ঢেলে ভেজা গামছায় গায়ে জড়িয়ে কলসি ভরে সে ফিরে আসে । নদীতে নামাটা যত না সহজ তার চেয়ে অনেক কঠিন পিচ্ছিল মাটি বেয়ে ওঠা । মালতী ভেজা পা টিপে টিপে উপরে উঠে আসে । ঘরে ফিরে দেখে মাধব তখনো ফিরেনি । সে মাধবকে চেনে । আজ সে ফিরতে কিছুটা দেরিই করবে ।

ঘরে কিছু বেগুন আর চ্যাপা শুঁটকি ছিল । মালতী বেগুনের নিরামিষ আর চ্যাপা ভর্তা করে সারা বিকেল অপেক্ষা করে থাকে । কিন্তু মাধবের কোন খোঁজখবরই নেই । পশ্চিম দিকে রক্তিম সূর্য গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে । মালতীর প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা হতে থাকে । লোকটা গেল কোথায় ? এত দেরি তো কখনো করে না ! ক্ষুধায় সে কাতর হয়ে ওঠে । কিন্তু, স্বামীকে না খাইয়ে তার খাওয়ার অভ্যেস নেই ।

মাধব ফেরে রাত নয়টার দিকে । রাত নয়টা গ্রাম এলাকায় বলতে গেলে মধ্যরাত । গ্রামের সবাই গভীর ঘুমে অচেতন । মালতীও বারান্দায় বসে ঝিমুচ্ছিল ।

মাধবকে দেখে মালতী কোন কথা না বলে তরকারি গরম করতে চলে যায় । ভাত তরকারি নিয়ে এসে দেখল মাধব হাত মুখ ধুয়ে শুয়ে পড়েছে । পাতে তরকারি সাজিয়ে ঘরে এসে মাধবকে খেতে ডাকে ,

“ভাত গরম করছি । খাইয়া লও ।”
“আমি খামু না । খিদা নাই । তুই খা গিয়া ।” গম্ভীর স্বরে বলে মাধব ।
“খিদা নাই মানি ? বাইর থন খাইয়া আইছ ?”মালতীর গলায়ও উস্মা ।
“কইথন খাইয়া আইছি না আইছি হেইডা তোর জাননের কাম নাই । তুই খাইলে খা । না খাইলে যা ইচ্ছা কর । আমি খামু না ।”
“না খাইলা । আমিও খাইতাম না ।”

মালতী দম দম করে পা ফেলে সব খাবার রান্নাঘরে রেখে আসে । ঘরে এসে কুপির আলোটা কমিয়ে শুয়ে পড়ে । একে তো সারাদিন না খাওয়া তার উপর মাধবের আচরণ তাকে আরও দুঃখী করে তোলে । বিছানায় উপুড় হয়ে সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। কিন্তু মাধবের সে দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই । মাধব আজ কিছুটা অস্বাভাবিক উদ্ভ্রান্ত । বিপীনপার্কে বিমলের সাথে দেখা হয়েছিল সে বাংলা খাইয়ে আরো টাল করে দিয়েছে।

কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিল মালতীর মনে নেই । হটাৎ ঘুমের ঘোরে শরীরের উপর তীব্র চাপ অনুভব করে সে । নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য হাঁসফাঁস করে জেগে উঠে । মাধবের মুখ তার মুখের উপর । ওষ্ঠাধর চেপে বসেছে তার ওষ্ঠের উপর মনে হচ্ছে প্রচন্ড আক্রোশে দাঁত দিয়ে ঠোঁট দুটো ছিড়ে ফেলবে। কিন্তু মাধবের ঠোঁটে কোন উষ্ণতা নেই । মালতীর শরীর মাধবের শরীরের মধ্যে যেন পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে । নারীর শরীর পুরুষ শরীরের ভাষা বোঝে । কোনটা ভালবাসা আর কোনটা জোর সেটা সে মুহূর্তেই জেনে যায় । তারপরও মালতী জেনে বুঝেই মাধবের জোরে সাড়া দিতে চায় । কিন্তু মাধবের যে শুধুই মনের আক্রোশ সেটা বুঝতে তার সময় লাগে না ।

মাধব চাপা স্বরে অশ্লীল একটা গালি দিয়ে বলে ওঠে ,“বাজাইরা মাগী, আইজকা দেখবাম তোর কয়জন মরদ লাগে ।”

ঘৃণায় মালতীর শরীর সংকুচিত হয়ে আসে । ওষ্ঠে কে যেন তার বিছুটি লাগিয়ে দেয় । শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে মাধবকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে উঠে বসে ।

অসংলগ্ন বেশ , উস্কখুস্ক চুল আর গ্রীবা বাঁকা মালতীকে ফণা তোলা নাগিনীর মত ভয়ঙ্কর মনে হয় । কুপির স্বল্প আলোয় মাধব দেখে মালতীর সুন্দর দুটি চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে ।

“শইলে শক্তি নেই আবার বউয়ের লগে জুর খাটাতি আহো ? না-মরদ কুনহানের” হিসহিস করে ওঠে মালতী ।

মাধব অবাক হয়ে মালতীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে । এই মালতীকে সে চেনে না । সে চোখের দৃষ্টিতে ভালবাসা দূরে থাক স্নিগ্ধতার লেশ মাত্র নেই । আছে প্রবল ঘৃণা আর অবজ্ঞা ! এই দৃষ্টি তার চিত্রপটে মোহরাঙ্কিত হয়ে গেল । জীবনে সে ভুলবে না । সে বিহ্বল হয়ে মালতীর দিকে তাকিয়েই থাকে কোন কথার প্রতিবাদ করে না ।

মালতী কিছুসময় ব্যর্থ আক্রোশে ফুলতে থাকে তারপর একসময় ধীরে ধীরে উঠে দরজা খুলে বারান্দায় এসে বসে । আজ পূর্ণিমা রাত । সমস্ত দুনিয়া যেন রুপোলী আলোয় ঝলমল করছে । দুচোখে প্রবল বন্যা নিয়ে মালতী সেই পুর্ণিমাতে ভিজতে থাকে।

একসময় আকাশে দিনের আলো ফুটতে শুরু করে । মালতী চোখ মুছে দৈনন্দিন কাজে লেগে যায় । তার মধ্যে তেমন কোন ভাবাবেগ দেখা দেয় না । আর দশটা দিনের মত স্বাভাবিক । রাতে যেন কিছুই ঘটেনি এমন ভাব । কিন্তু মাধবের মনে শান্তি নেই ।  সন্তানহীন হওয়ার যন্ত্রণা তারও রয়েছে কিন্তু একজন স্ত্রীর কাছে স্বামীর অক্ষমতার যন্ত্রণাটা সে মুলত গতরাতে উপলদ্ধি করতে পেরেছে । কাজের ফাঁকে প্রতি মুহূর্তে মালতীর দুটি চোখ তাকে তাড়া করে ফেরে । কানে রিরি করে বাজতে থাকে “না মরদ” । বুকের গভীরে কোথাও একটা ক্ষত তৈরী হয় এবং সেটা ক্রমেই আরো বিস্তৃত আর বিশাল হতে থাকে।

সারাদিনে দুইজনের মধ্যে তেমন কোন কথাবার্তা হয়না । সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি খেয়ে মাধব শুয়ে পড়ে কিন্তু ঘুম আসে না। ছনের চালের দিকে তাকিয়ে বিছানায় চুপচাপ পড়ে থাকে । কিছুক্ষণ পরে মালতীও এসে একপাশে শুয়ে পড়ে । অন্যদিন হলে তারা এইসময় একটু গল্পগুজব করে যার বেশির ভাগই সাংসারিক । কিন্তু আজ আর কোন কথা হয় না ।
গভীর রাত ! একবুক তৃষ্ণা নিয়ে ধড়মড় করে জেগে উঠে মাধব । জেগেই আগে দৃষ্টি পড়ে মালতীর দিকে । কিন্তু সে হতবাক হয়।বিছানায় মালতী নেই । কোথায় গেল ? মালতী তো তাকে ছাড়া কখনো রাতে ঘরের বাইরে যায় না!

ঘরের দরজা ভেজানো । আস্তে করে দরজা খুলে সে বাইরে এসে দাঁড়ায় । বারান্দার এককোণে চাঁটাই দিয়ে ঘিরে আরেকটা ঘরের মত তৈরি করেছিল মাধব । আত্মীয় স্বজন আসলে লাগে । তারা নিজেরাও মাঝে মাঝে গরমের রাতে এই ঘরটিতে ঘুমায় । আজ বড় গরম পড়েছে মালতী হয়ত ওখানে শুয়েছে ।

একটু দ্রুত পায়েই এগিয়ে যেতে থাকে মাধব। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়ায় । ঘর থেকে নারী পুরুষের সম্মিলিত অস্পষ্ট শিৎকার ভেসে আসছে । রাগ আর ঘৃণায় শরীর কাঁপছে মাধবের। সে চিৎকার করতে চায় কিন্তু আচমকাই সে রাতের মালতী হিসহিস করে ফণা তোলে, “না মরদ” ।

মন্তব্য করুন
Advertisement
অর্থনৈতিক বৈষম্যজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্ব
মতামত1 day ago

অর্থনৈতিক বৈষম্যজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্ব | রায়হান আহমেদ

কবি বীরেন মুখার্জী : প্রদীপ্ত পঞ্চাশ
শুভ জন্মদিন2 weeks ago

কবি বীরেন মুখার্জী : প্রদীপ্ত পঞ্চাশ

মামুন সারওয়ারের চারটি গ্রন্থ
সাহিত্য জগৎ3 weeks ago

বইমেলায় মামুন সারওয়ারের চারটি বই

মেলায় প্রতিভা রানীর তিন বই
সাহিত্য জগৎ3 weeks ago

বইমেলায় প্রতিভা রানী কর্মকারের তিনটি বই

বড়ো উৎসব
সাহিত্য জগৎ3 weeks ago

 বাঙালির কবিতা উৎসব

মেলায় ১০০ শব্দের গল্প সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ড
সাহিত্য জগৎ3 weeks ago

বইমেলায় ১০০ শব্দের গল্প সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ড

বইমেলায় তন্ময় মণ্ডলের ‘পালক জীবন’
সাহিত্য জগৎ3 weeks ago

বইমেলায় তন্ময়ের তৃতীয় ‘পালক জীবন’

বইমেলায় আপন অপুর ‘ফুটল হাসি সবার মুখে’
সাহিত্য জগৎ3 weeks ago

 আপন অপুর ‘ফুটল হাসি সবার মুখে’

অন্যান্য4 weeks ago

দেশিয় শিল্পীরা এখন চলচ্চিত্র দেখে না, ওদের বয়কট করুন (ভিডিওসহ) – শামীমুল ইসলাম শামীম

জয়া আহসান। ছবি : সংগৃহীত
বাংলা সিনেমা4 weeks ago

সার্কাস দেখাবেন জয়া আহসান!

অন্যান্য4 weeks ago

দেশিয় শিল্পীরা এখন চলচ্চিত্র দেখে না, ওদের বয়কট করুন (ভিডিওসহ) – শামীমুল ইসলাম শামীম

মুনমুন। ছবি: সংগৃহীত
তারকা গসিপ4 weeks ago

আমাকে সবাই অশ্লীল সময়ের নায়িকা বলে, বিষয়টি ঠিক না : মুনমুন

নিজেকে একজন ভালো অভিনয়শিল্পী হিসেবে দেখতে চান সেতু হায়দার
অন্যান্য4 weeks ago

‘ধোঁকা খেয়ে শক্ত হয়েছি’

মেলায় ১০০ শব্দের গল্প সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ড
সাহিত্য জগৎ3 weeks ago

বইমেলায় ১০০ শব্দের গল্প সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ড

অপু বিশ্বাস ও শাকিব খান। ছবি : সংগৃহীত
বাংলা সিনেমা4 weeks ago

কলকাতায় অপু বিশ্বাস, সঙ্গে শাকিব খান!

মামুন সারওয়ারের চারটি গ্রন্থ
সাহিত্য জগৎ3 weeks ago

বইমেলায় মামুন সারওয়ারের চারটি বই

মেলায় প্রতিভা রানীর তিন বই
সাহিত্য জগৎ3 weeks ago

বইমেলায় প্রতিভা রানী কর্মকারের তিনটি বই

শাকিব খান ও শবনম বুবলী। ছবি : সংগৃহীত
বাংলা সিনেমা4 weeks ago

অপু বিশ্বাসের পর শবনম বুবলীকে নিয়ে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় শাকিব খান

‘বকুলকথা’ ধারাবাহিকের একটি দৃশ্য। ছবি সৌজন্য: জি বাংলা
ছোটপর্দা4 weeks ago

সোশ্যাল ড্রামাই দর্শক টানছে বেশি

জয়া আহসান। ছবি : সংগৃহীত
বাংলা সিনেমা4 weeks ago

সার্কাস দেখাবেন জয়া আহসান!

শাকিব খান ও রোদেলা জান্নাত। ছবি : ইউটিউভ
বাংলা সিনেমা2 months ago

শাকিব খান- রোদেলা জান্নাতের চুমুর দৃশ্য একদিনেই ভাইরাল (ভিডিও)

সোনিয়া খান। ছবি : ফেসবুক
অন্যান্য2 months ago

‘নায়িকা’ হলেন সোনিয়া খান

ইত্যাদিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আকবরের নতুন গান
সুরের মূর্ছনা2 months ago

ইত্যাদিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আকবরের নতুন গান

শাহরুখ-কন্যা সুহানা খান। ছবি : ইন্টারনেট
বলিউড2 months ago

পানির নীচে কার সঙ্গে শাহরুখ-কন্যা সুহানা! (ভিডিও)

গুলশান-বনানীর পারিবারিক জীবন নিয়ে শর্টফিল্ম 'অপরাধী'
অন্যান্য2 months ago

গুলশান-বনানীর পারিবারিক জীবন নিয়ে শর্টফিল্ম ‘অপরাধী’

সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের মরুভূমিতে বন্যা। ছবি: সংগৃহীত
রূপালী আলো4 months ago

সৌদি আরবের মরুভূমিতে বন্যা! (ভিডিও)

বিয়ের প্রথম রাতে নারী-পুরুষ উভয়েই মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো
রূপালী আলো4 months ago

বিয়ের প্রথম রাতে নারী-পুরুষ উভয়েই মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো

আরমান আলিফ
রূপালী আলো4 months ago

সন্দেহ ডেকে আনে সর্বনাশ : আরমান আলিফ

সালমান শাহকে নিয়ে সেই গান প্রকাশ হল
রূপালী আলো6 months ago

সালমান শাহকে নিয়ে সেই গান প্রকাশ হল, পরীমনির প্রশংসা

পাকিস্তানের ক্যাপিটাল টিভি চ্যানেলে প্রচারিত টকশোর স্ক্রিনশট। ছবি: সংগৃহীত
রূপালী আলো7 months ago

সুইডেন নয়, পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ হতে চায় (ভিডিও)

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : বীরেন মুখার্জী
হেড অব মার্কেটিং : দীনবন্ধু রায়
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম