fbpx
Connect with us

বিবিধ

একটি পনেরই আগস্ট ও বর্তমান প্রেক্ষাপট | রীনা তালুকদার

Published

on

রাস্তায় গভীর নির্জনতা। রাত শেষ হয়ে তারপর ভোর হবার অপেক্ষা। জানালা দিয়ে বাইরে যতোদূর দেখা যায়। কোনো মানুষের বিচরণ নেই। মাঝে মধ্যে কেবল রাস্তায় দু’একজন রাতের পুলিশের হাটাচলা। পরদিন পনেরই আগষ্টের ভোর। সরকারী ছুটির দিন। ভোর বেলাটাই কেমন থম থমে ভাব নিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে আজ পনেরই আগষ্ট। চেতনায় আঘাত করে যাচ্ছে অলি-গলিতে বাজানো গান ..যদি রাত পোহালে শোনা যেতো, বঙ্গবন্ধু মরে নাই, তবে বিশ্ব পেতো এক মহান নেতা, আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা। অথবা শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, আকাশে বাতাসে ওঠে রনি… বাংলাদেশ এসব হৃদয় ব্যথিত করা সেই সুরগুলোও জানান দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মাঝে কোনো তাড়া নেই। চলাচলে খুব একটা তাড়া বোধ করে না কেউ। রাস্তায় নামি। দেখি মানুষ কেমন যেনো মূক। মোড়ে মোড়ে যুবকেরা জড়ো হয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার বাজাচ্ছে। মুজিবকে ঘিরে যে সমস্ত গান রচিত হয়েছে সেগুলো একের পর এক বাজিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ক্যাসেট প্লেয়ারে আবৃতি শোনা যাচ্ছে। মুজিব মানে আর কিছু না, মুজিব মানে মুক্তি, পিতার সাথে সন্তানের ঐ না লেখা প্রেম চুক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি।

ভাবছি মুজিব নেই কিভাবে বিশ্বাস করি, মুজিব সবখানেই তো উপস্থিত। মুজিব কেবল মাত্র লোক চক্ষুর সামনে থেকে অদৃশ্য হয়েছে মাত্র। হারিয়ে যায়নি। অলিতে-গলিতে, আকাশে-বাতাসে, চলাচলে সবখানে সবকিছুই জানান দিচ্ছে মুজিব আছে। মুজিব আছে প্রতিটি বাঙালির হৃদয় আসনে। মুজিব অদৃশ্য লোকের মায়ায় আবদ্ধ করেছে মুজিব কাঙাল বাঙালিকে। রাস্তা-ঘাট মানুষের ভোর বেলার নীরবতা যদি এমন ভাবে হৃদয়ের কড়া ধরে নাড়া দেয় আজ এত বছর পরেও। তবে সেদিনের পনেরই আগষ্টের ভোর মানুষকে কিভাবে বিমুঢ় করেছিলো। সেটি ভাবতে কোনো কষ্ট হয় না। সমস্ত বাঙালির পক্ষ হতে ধিক্কার জানাই পঁচাত্তরের পনেরই আগষ্টকে। যে পনেরই আগষ্ট না হলে বাঙালি মুজিবহীন হতোনা। অই পনেরই আগষ্টই মুজিবকে অদৃশ্য করে দিয়েছে বাঙালির কাছ থেকে। একই সাথে এ সোনার বাংলাকে আবারো এক শতাব্দী পিছনে ঠেলে দিয়েছে।

দীর্ঘ ৩৪ বছর সময়ের পরে এসে বাঙালি আজ কিছুটা গুছিয়ে নিয়েছে। ২৫ শে মার্চ, ১৯৭১ রাতের হত্যাযজ্ঞ চলছিলো ভোর পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর হত্যাও ভোররাতে ঠিক আজানের সময়ে। এরা মুসলমান! এরা কারা ? ২৫ মার্চ রাত আর ১৫ আগস্ট রাত দুটি রাতের হত্যাযজ্ঞের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ধারাবাহিকা আছে। দু:সময়ের ঘটনার আচরণ মিলে যায়। সেই পনেরই আগষ্টের মহারথীদের মুখে কিছুটা এ্যাবড়ো থ্যাবড়ো কালি মেখে দিতে সক্ষম হয়েছে। সে ঘৃণ্যতম হত্যাকান্ডের বিচারের রায় হয় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারী । এ রায়ে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। তার মধ্যে ৫ জনের শাস্তি কার্যকর করা হয়। ২৭ জানুয়ারী জাতি কলঙ্কের দায়ভার কিছুটা হলেও কমানোর চেষ্টা করেছে। ঐ মহারথীদের মুজিব হত্যার জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছিলো বিদেশে পূর্নবাসন এবং চাকুরী দিয়ে। কুখ্যাত আইন ৭৫ -এর ২৬ শে সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে মুজিবহত্যার বিচারের পথ অবরুদ্ধ করেছে পরবর্তী রাষ্ট্র নায়কেরা। বঙ্গবন্ধু কন্যাকে করেছিলো দেশ ছাড়া এবং অধিকার বঞ্চিত। ঐ কালো আইন একাধারে করেছিলো মৌলিক অধিকার হরণ, মানবাধিকার লংঘন, শিশু- নারী হত্যা, এবং চরম ঘৃণ্যতম আচরণ বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের বুকে ছুঁড়েছিলো গুলি। ইতিহাসের দুটি ধারা বা দুটি দিক। একটি বিখ্যাত অন্যটি বিপরীত শব্দের কুখ্যাত ধারা। এ দু-ধারার পথ ধরেই ইতিহাস হাটে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার পক্ষ আর অন্য পক্ষ মীরজাফর। ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত আর কুখ্যাত শব্দ দুটির বিশ্লেষনেই ইতিহাস সৃষ্টি হয়। মীর জাফরদের ইতিহাসের পাতায় স্থান হয়েছে ইতিহাসের ডাষ্টবিন খ্যাত কুখ্যাত অংশে। ১৭৫৭ সালের সিরাজদ্দৌলা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলো আবারও। কুখ্যাত ইনডেমনিটি এ্যাক্টের পিতা খন্দকার মোশতাকও ইতিহাসের ডাষ্টবিন অংশে স্থান পেয়েছে। যে মোশতাকের বিদেশের মাটিতে বিনা চিকিৎসায় জীবনের যবনিকা পাত হয়েছিলো।

বিশ্ব অবাক আর হত বিহবল সেই ৭৫ এর আগষ্ট দেখে। যে বাঙালির জন্য মুজিব পাকিস্তানের কারাগারে তাঁর নিজের জন্য খোঁড়া কবর দেখে একটুও বিচলিত হননি। বলেছিলেন, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, বাঙালি একবারই মরে, বার বার মরে না । সেই মহান নেতার মৃত্যু শোক করবে তাঁর স্বজন নাগরিকরা, তাও নানান কায়দায় জিয়া আদর্শের সরকার বিভিন্ন ভাবে ঐ মুজিব প্রেমিকদের পনেরই আগষ্ট ঘিরে বহু ধর পাকড় করেছে, মিলাদের মাইকের সাউন্ড বন্ধ করে দিয়েছে, কাঙালী ভোজের সেই গরীব দুঃখির খাবারে বিষ মিশিয়েছে। আবার জিয়া স্ত্রীর জন্মদিন উৎসবের নতুন গল্প জুড়ে দিয়েছে। তবে কি মুজিব পরিবারের হত্যা খালেদা জিয়ার জন্ম উৎসবের আনন্দই ছিলো ? যুদ্ধের পর কথিত আছে জিয়ার সাথে সংসারের টানাপোড়েন বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে ঠিক হয়। শোনা যায় জিয়ার আপত্তি ছিলো সংসারে, নাকি সে সময় খালেদা জিয়ারও আপত্তি ছিলো সংসারে। আর সে প্রতিশোধে তিনিও অংশীদার পনের আগষ্টের…। এসবও ইতিহাস নীরব দর্শক হয়ে দেখেছে।

১৯৭৫ -এর পনেরই আগস্ট বিশ্ব জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছিলো। বিশ্ব অবাক হয়েছিলো যে মুজিবকে হত্যার সাহস করেনি পাকিস্তান বাঙালির মতো রণ জনতার ভয়ে; সে বাঙালি পাগল মুজিব প্রাণ দিয়েছে তাঁরই বাঙালির হাতে !! প্রাণ দিয়েছে তাঁর পুরো পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, কর্মকতা-কর্মচারীবৃন্দ সহ ২৯ জন মানুষ সকলেই। নিজের রক্তের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা ইতিহাসে বীর বাঙালি শব্দটির পাশে কলংকিত শব্দ বেঈমান শব্দটি সংযোজন করেছে ঘাতক মোশতাক। মোশতাককে এ অধিকার কখনই দেয়নি বাঙালি জাতি। পাকিস্তানিদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেছিলো বেঈমান মোশতাক। বিশ্ব মানচিত্রের বুক ক্ষত বিক্ষত করেছে শকুন মোশতাক। জেগে ওঠেছিলো ৭১ -এর হায়েনারা যারা বাংলার বিজয়ে গর্তে লুকিয়েছিলো, তাদের পথ দেখিয়েছে মোশতাক এবং পরবর্তী সেনা শাসকেরা। পেছন পথ দিয়ে ক্ষমতা দখল করে পবিত্র সেনা বাহিনীকে নিজেদের ব্যক্তিগত খায়েশে ব্যবহার করে হ্যাঁ-না ভোট নিয়ে গণতন্ত্রের সংগা মুখস্ত করিয়েছে এদেশের গেরিলারা যুদ্ধজয়ী জনতাকে সেনা শাসকেরা। রাজত্ব লোভী কুমিরেরা বাংলার রূপরেখা আঁকে তাদের নিজস্ব কল্পিত চিত্রপট অনুযায়ী। কিন্তু ইতিহাস আবারও পাতা খুলে রাখে। নতুন কোনো ঘটনা লিপিবদ্ধ হবে এই প্রত্যাশায় ইতিহাস অপেক্ষা করে। প্রকাশ হয়ে যায় রাজত্বলোভীদের ভাগ-বাটোয়ারার ক্যারিশমা। যে বুলেট বঙ্গবন্ধুকে বাঁচতে দেয়নি, সে বুলেট উল্টো প্রতিশোধের নেশায় তাকিয়ে ছিলো। বাঁচতে দেয়নি সেনা শাসককেও। যে জিয়াউর রহমান ১৯৭৫-এর ২৬শে সেপ্টেম্বর জারীকৃত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি সংবিধানের ৯২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ অনুমোদন না নেয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই এ অধ্যাদেশ প্রাণহীন হয়ে যায়; সে প্রাণহীন অধ্যাদেশটি তিনি ২৩ শে এপ্রিল, ১৯৭৬ এ নব জীবন দিয়ে ২৭ এপ্রিল এক সামরিক ফরমান জারী করে ৬ ই এপ্রিল ৫ম সংশোধনীর মোড়কে চতুর্থ তপসিলে ৩ক এবং ১৮ অনুচ্ছেদে সংযোজন করে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানকে কলংকিত করেন। যাতে করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না হয় কোনদিন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দেশের জনতা ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছে। ইতিহাসকে দিয়েছে গতি। কিন্তু মৃত আইনটি জীবিত করে খুনীদের বিদেশে পুর্নবাসন করেছিলেন জিয়াউর রহমান কিসের ভয়ে ! নাকি ক্ষমতার লোভে ? তবে কি জেনারেল জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনাকারীদের একজন ? নচেৎ ঐ আইনকে এত পাকাপোক্ত করে সংবিধানে সংযোজন করার প্রয়োজন মনে করলেন কেন ?

পরবর্তী প্রেক্ষাপট আরো স্পষ্ট ৭৫ -এর পনেরই আগষ্টের ধারাবাহিকতায় জাতীয় চার নেতা হত্যা সহ জেনারেল জিয়ার সিপাহী বিপ্লব নামের বিভ্রান্তি সকলেরই জানা। স্বৈর শাসক জেনারেল এরশাদ এবং গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের উত্তরণ। পনেরই আগষ্ট আসে আর যায়। আমরা মুজিব পাগল বাঙালি রাস্তায় মিছিল করি, পোষ্টার, ব্যানার, ফেষ্টুনে আমাদের মনের আকুতি জানাই, পুলিশি নির্যাতন স্বীকার হই। স্বীকার হই জিয়া আদর্শের সৈনিকদের অত্যাচারের। প্রাণ দেয় কতো যুবক। তবুও আশায় বুক বাধি। জঘণ্য সে আইন আর সঠিকপথে ঘুরে না। দীর্ঘ সময়ের প্রতীক্ষার প্রহর শেষে বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতে ঐ কলংকিত আইন পবিত্র বাংলার সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। জাতি দেখেছে কি প্রতীক্ষায় পনেরই আগষ্ট আসে আর যায়। তারপর ভোর দেখেছে অনেক সময় পেরিয়ে ২৭ জানু. ২০১০ সালে। জাতির পরম সৌভাগ্য হয়েছে আমরা দেখেছি ঐ চোরে চোরে মাসতুতো ভাইদের ফাঁসি। আমরা প্রত্যাশা করি খুব শীঘ্রই হবে এ বিচারের বাকী অংশের কাজ। যাদের জন্য ইতিহাস এখনো স্থান শূন্য করে রেখেছে। এখন প্রতিবছর পনেরই আগস্ট আসলে অন্তত: জাতি মনকে প্রবোধ দিবে এই ভেবে যে, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আইনের জয় হবেই হবে একদিন কারো না কারো হাতে। এই আশা আছে জাতির নিরীহ নাগরিকদের। অপরাজিত শক্তিকে মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুকে বাঙালী জাতির স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার যে দীর্ঘ সময়ের অপকৌশল তারা করেছিলো সেটি যুদ্ধজয়ী জাতির কাছে প্রকাশ হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমানের চাইতে অনেক বেশী শক্তি আর সাহস জুগিয়ে চলেছেন নিরন্তর।

রীনা তালুকদার
কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

মন্তব্য করুন
Continue Reading
Advertisement
Advertisement
ইত্যাদিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আকবরের নতুন গান
রূপালী আলো2 years ago

ইত্যাদিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আকবরের নতুন গান

শাহরুখ-কন্যা সুহানা খান। ছবি : ইন্টারনেট
রূপালী আলো2 years ago

পানির নীচে কার সঙ্গে শাহরুখ-কন্যা সুহানা! (ভিডিও)

গুলশান-বনানীর পারিবারিক জীবন নিয়ে শর্টফিল্ম 'অপরাধী'
রূপালী আলো2 years ago

গুলশান-বনানীর পারিবারিক জীবন নিয়ে শর্টফিল্ম ‘অপরাধী’

সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের মরুভূমিতে বন্যা। ছবি: সংগৃহীত
রূপালী আলো2 years ago

সৌদি আরবের মরুভূমিতে বন্যা! (ভিডিও)

বিয়ের প্রথম রাতে নারী-পুরুষ উভয়েই মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো
রূপালী আলো2 years ago

বিয়ের প্রথম রাতে নারী-পুরুষ উভয়েই মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো

আরমান আলিফ
রূপালী আলো2 years ago

সন্দেহ ডেকে আনে সর্বনাশ : আরমান আলিফ

সালমান শাহকে নিয়ে সেই গান প্রকাশ হল
রূপালী আলো2 years ago

সালমান শাহকে নিয়ে সেই গান প্রকাশ হল, পরীমনির প্রশংসা

পাকিস্তানের ক্যাপিটাল টিভি চ্যানেলে প্রচারিত টকশোর স্ক্রিনশট। ছবি: সংগৃহীত
রূপালী আলো2 years ago

সুইডেন নয়, পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ হতে চায় (ভিডিও)

Drink coffee in a tank of thousands of Japanese carp in Saigon
রূপালী আলো2 years ago

যে রেস্টুরেন্টে আপনার পা নিরাপদ নয় (ভিডিওটি ২ কোটি ভিউ হয়েছে)

ঘাউড়া মজিদ এখন ব্যবসায়ী
রূপালী আলো2 years ago

‘ঘাউড়া মজিদ এখন ব্যবসায়ী’ (ভিডিও দেখুন আর হাসুন)

সর্বাধিক পঠিত